ফুটবল বিশ্বে আর্জেন্টিনা শুধু একটি দলের নাম নয়, এটি কোটি ভক্তের আবেগ, উন্মাদনা আর হৃদস্পন্দন। মাঠের পায়ের জাদু আর গ্যালারির আকাশী-সাদা রঙের জোয়ার—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা ফুটবল মানেই এক জীবন্ত রূপকথা। সম্প্রতি ফুটবলপ্রেমীদের নজর কেড়েছে আর্জেন্টিনার নতুন জার্সি। প্রথাগত আকাশী-সাদা ডোরার এই জার্সির পেছনে গলার ঠিক নিচে একটি বিশেষ সংখ্যা স্থান পেয়েছে, যা হলো ‘১৮৯৩’। প্রথম নজরে এটিকে কোনো সাধারণ নকশা বা কোড মনে হতে পারে, তবে এর অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে লাতিন আমেরিকার ফুটবলের পাওয়ার হাউস আর্জেন্টিনার এক শতাব্দী প্রাচীন গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
রহস্যের উন্মোচন: কী এই ১৮৯৩?
জার্সিতে খোদাই করা এই সংখ্যাটি মূলত কোনো খেলোয়াড়ের নম্বর বা কোনো একক ম্যাচের পরিসংখ্যান নয়। এটি হলো ‘আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন’ (AFA)-এর আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠার বছর। আজ থেকে ১৩৩ বছর আগে, ১৮৯৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এই ঐতিহাসিক ফুটবল সংস্থাটি যাত্রা শুরু করেছিল। ইউরোপের বাইরে এটিই বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ জাতীয় ফুটবল ফেডারেশন। বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনার এই সুদীর্ঘ পথচলা এবং ঐতিহ্যকে রাজকীয় সম্মান জানাতেই অফিসিয়াল কিট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস (Adidas) ও এএফএ যৌথভাবে নতুন জার্সিতে এই সংখ্যাটি যুক্ত করেছে।
আর্জেন্টাইন ফুটবলের জনক ও আদি কথা
এই ইতিহাসের পেছনে রয়েছেন স্কটিশ বংশোদ্ভূত এক দূরদর্শী ক্রীড়া শিক্ষক, যার নাম আলেকজান্ডার ওয়াটসন হাটন (Alejandro Watson Hutton)। ১৯ শতকের শেষের দিকে বুয়েনস আইরেসে তাঁর হাত ধরেই এই অ্যাসোসিয়েশনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। আর্জেন্টিনায় ফুটবলের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং একে সাধারণ মানুষের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে তাঁর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। আর এই কারণেই তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে ‘আর্জেন্টাইন ফুটবলের জনক’ বলে অভিহিত করা হয়। জার্সির গলার নিচে লেখা ‘১৮৯৩’ সংখ্যাটি হাটন এবং তাঁর সমসাময়িক ফুটবল অগ্রদূতদের প্রতি এক অনন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ঐতিহ্য, আধুনিকতা ও তিন তারার মেলবন্ধন
নতুন এই জার্সিটিতে শুধু পেছনের দেয়ালে ইতিহাসের শুরুটাকেই তুলে ধরা হয়নি, বরং এর সামনের অংশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আধুনিক ফুটবলের সর্বোচ্চ অর্জনের গল্পও। জার্সির বুকে জ্বলজ্বল করা এএফএ লোগোর ওপর যুক্ত রয়েছে তিনটি সোনালী তারা। এই তারা তিনটি যথাক্রমে ১৯৭৮, ১৯৮৬ এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের অমর কীর্তিকে নির্দেশ করে। একই সাথে জার্সির মূল নকশায় যে নীল রঙের বিভিন্ন শেড ব্যবহার করা হয়েছে, তা-ও এই তিন বিশ্বকাপজয়ী দলের জার্সির রঙ থেকে অনুপ্রাণিত।
ফুটবল যখন সংস্কৃতির আয়না
আর্জেন্টাইনদের কাছে তাদের জাতীয় দলের জার্সি কেবল একটি খেলার পোশাক নয়; এটি তাদের সংস্কৃতি, প্রতিরোধ এবং ঐক্যের প্রতীক। দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই ১৯৮৬ সালের অবিস্মরণীয় ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ থেকে শুরু করে লিওনেল মেসির কাতার বিশ্বকাপের কান্না ও হাসির গল্প—সবকিছুই মিশে আছে এই কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে।
জার্সির পেছনে এই ‘১৮৯৩’ সংখ্যার সংযোজন বিশ্বজুড়ে থাকা কোটি কোটি আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের মনে করিয়ে দেয় যে, আজকের এই বিশ্বজয় কিন্তু একদিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা সংগ্রাম, সাধনা আর ফুটবলের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা। নতুন এই কিট গায়ে চাপিয়ে যখন মেসিবাহিনী মাঠে নামে, তখন তারা কেবল বলের পেছনেই ছোটেন না, বরং পিঠে বয়ে বেড়ান ১৩৩ বছরের এক সুদীর্ঘ ফুটবল লেগেসি।
মোঃ রওশন আলী -বিশেষ প্রতিনিধি,দৈনিক প্রান্তিক। 

























