Dhaka ০২:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা: অনিশ্চয়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তির আওতায় আনার সময় শিক্ষার মানোন্নয়ন, সেশনজট নিরসন এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, প্রায় এক দশক পরও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা এখন সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের অন্যতম বড় ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও ফলাফল প্রকাশ না হওয়ায় তারা উচ্চশিক্ষা, চাকরির প্রস্তুতি ও একাডেমিক অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

২০১৭ সালে রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজ—ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ এবং সরকারি বাঙলা কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ সেশনজট থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি দেওয়া এবং উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফল প্রকাশ, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মতিউর রহমান বলেন, “পরীক্ষা শেষ হয়েছে প্রায় চার মাস আগে। কিন্তু এখনো ফলাফল প্রকাশ হয়নি। এতে আমরা চরম হতাশায় ভুগছি। অনেক বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ইনকোর্স পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেছে। দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করা প্রয়োজন।”

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান। তাঁর ভাষ্য, “বর্তমানে চতুর্থ বর্ষের ইনকোর্স পরীক্ষা চলছে। আবার চূড়ান্ত পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচিও প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু তৃতীয় বর্ষের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল এখনো প্রকাশ হয়নি। কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছি কি না, তা জানতে না পারায় আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।”

সাত কলেজে অনার্স পর্যায়ে ২৫টি বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে ফলাফল প্রকাশের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থীকে ছয় মাস বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অতীতেও ফলাফল সমন্বয়, সিজিপিএ নির্ধারণ এবং পুনঃনিরীক্ষার ফল প্রকাশে দীর্ঘ বিলম্বের অভিযোগ উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনার্স চতুর্থ বর্ষ (২০২০-২১ সেশন)-এর ফলাফল পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশিত হলেও তৃতীয় বর্ষ (২০২১-২২ সেশন)-এর বেশিরভাগ বিভাগের ফল এখনো বকেয়া রয়েছে। দ্বিতীয় বর্ষ (২০২২-২৩ সেশন)-এর কয়েকটি বিভাগের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম বর্ষ (২০২৩-২৪ সেশন)-এরও অধিকাংশ বিভাগের ফল প্রকাশ করা হলেও সব বিভাগের ফল একসঙ্গে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী বলেন, সাত কলেজের ফলাফল প্রকাশ একটি চলমান ও সমন্বিত প্রক্রিয়া। বিভিন্ন কলেজ ও বিভাগের পক্ষ থেকে পরীক্ষার খাতা জমা দিতে বিলম্ব হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ফল প্রকাশে দেরি হয়। সংশ্লিষ্ট কলেজ ও বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে দ্রুত ফলাফল প্রকাশের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব এখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন, দেশি-বিদেশি বৃত্তি অর্জন, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী বর্ষে কোর্স নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়ছেন।

শিক্ষাবিদদের মতে, সাত কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিপুল হওয়ায় পরীক্ষা ও ফলাফল ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক ডিজিটাল কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় অধিভুক্তির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। ইতোমধ্যে সাত কলেজকে নিয়ে পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে নতুন কাঠামো নিয়ে সরকারও কাজ করছে। ২০২৬ সালে সাত কলেজকে কেন্দ্র করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ফলাফল প্রকাশে স্বচ্ছ সময়সূচি, ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং কলেজ-ভিত্তিক সমন্বয় জোরদার করা না গেলে শিক্ষার্থীদের এই ভোগান্তি দ্রুত কাটবে না। আর শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা—অধিভুক্তির প্রায় এক দশক পর অন্তত ফলাফল প্রকাশের মতো মৌলিক একাডেমিক সেবাটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নিশ্চিত করা হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

শাপলা চত্বর মামলা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরোয়ানায় লতিফ সিদ্দিকী গ্রেপ্তার

ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা: অনিশ্চয়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা

Update Time : ০১:২৬:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তির আওতায় আনার সময় শিক্ষার মানোন্নয়ন, সেশনজট নিরসন এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, প্রায় এক দশক পরও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা এখন সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের অন্যতম বড় ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও ফলাফল প্রকাশ না হওয়ায় তারা উচ্চশিক্ষা, চাকরির প্রস্তুতি ও একাডেমিক অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

২০১৭ সালে রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজ—ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ এবং সরকারি বাঙলা কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ সেশনজট থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি দেওয়া এবং উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফল প্রকাশ, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মতিউর রহমান বলেন, “পরীক্ষা শেষ হয়েছে প্রায় চার মাস আগে। কিন্তু এখনো ফলাফল প্রকাশ হয়নি। এতে আমরা চরম হতাশায় ভুগছি। অনেক বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ইনকোর্স পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেছে। দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করা প্রয়োজন।”

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান। তাঁর ভাষ্য, “বর্তমানে চতুর্থ বর্ষের ইনকোর্স পরীক্ষা চলছে। আবার চূড়ান্ত পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচিও প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু তৃতীয় বর্ষের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল এখনো প্রকাশ হয়নি। কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছি কি না, তা জানতে না পারায় আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।”

সাত কলেজে অনার্স পর্যায়ে ২৫টি বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে ফলাফল প্রকাশের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থীকে ছয় মাস বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অতীতেও ফলাফল সমন্বয়, সিজিপিএ নির্ধারণ এবং পুনঃনিরীক্ষার ফল প্রকাশে দীর্ঘ বিলম্বের অভিযোগ উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনার্স চতুর্থ বর্ষ (২০২০-২১ সেশন)-এর ফলাফল পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশিত হলেও তৃতীয় বর্ষ (২০২১-২২ সেশন)-এর বেশিরভাগ বিভাগের ফল এখনো বকেয়া রয়েছে। দ্বিতীয় বর্ষ (২০২২-২৩ সেশন)-এর কয়েকটি বিভাগের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম বর্ষ (২০২৩-২৪ সেশন)-এরও অধিকাংশ বিভাগের ফল প্রকাশ করা হলেও সব বিভাগের ফল একসঙ্গে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী বলেন, সাত কলেজের ফলাফল প্রকাশ একটি চলমান ও সমন্বিত প্রক্রিয়া। বিভিন্ন কলেজ ও বিভাগের পক্ষ থেকে পরীক্ষার খাতা জমা দিতে বিলম্ব হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ফল প্রকাশে দেরি হয়। সংশ্লিষ্ট কলেজ ও বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে দ্রুত ফলাফল প্রকাশের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব এখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন, দেশি-বিদেশি বৃত্তি অর্জন, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী বর্ষে কোর্স নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়ছেন।

শিক্ষাবিদদের মতে, সাত কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিপুল হওয়ায় পরীক্ষা ও ফলাফল ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক ডিজিটাল কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় অধিভুক্তির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। ইতোমধ্যে সাত কলেজকে নিয়ে পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে নতুন কাঠামো নিয়ে সরকারও কাজ করছে। ২০২৬ সালে সাত কলেজকে কেন্দ্র করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ফলাফল প্রকাশে স্বচ্ছ সময়সূচি, ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং কলেজ-ভিত্তিক সমন্বয় জোরদার করা না গেলে শিক্ষার্থীদের এই ভোগান্তি দ্রুত কাটবে না। আর শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা—অধিভুক্তির প্রায় এক দশক পর অন্তত ফলাফল প্রকাশের মতো মৌলিক একাডেমিক সেবাটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নিশ্চিত করা হবে।