বিপ্লবী স্ফুলিঙ্গের প্রথম প্রহর: ১ ও ২ জুলাইয়ের মহাকাব্য
মোঃ আলফাজ উদ্দিন-সম্পাদক,দৈনিক প্রান্তিক।
২০২৪ সালের ১ জুলাই। আপাত শান্ত এই রৌদ্রোজ্জ্বল দিনটির গর্ভেই লুকিয়ে ছিল এক দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তস্নাত মহাবিপ্লবের বীজ। দীর্ঘ ১৬ বছরের জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা স্বৈরাচারের বুকে প্রথম যে কাঁপন ধরেছিল, তার সূচনাপর্ব রচিত হয়েছিল এই শ্রাবণ-দিনের তপ্ত রাজপথে। অধিকারহারা, শোষিত এক তুণমূল প্রজন্মের বুকের ভেতর চেপে রাখা পুঞ্জীভূত বারুদ হঠাৎ করেই যেন এক মহাশক্তিতে বিস্ফোরিত হতে শুরু করল। তৎকালীন স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ও তার দোসররা হয়তো ভাবতেও পারেনি—যে তরুণ সমাজকে তারা চিরকাল বুটের তলায় পিষ্ট করে রাখতে চেয়েছে, তারাই এক রক্তিম সূর্যোদয়ের মহাকাব্য লিখতে যাচ্ছে।
দৈনিক প্রান্তিকের বিশেষ আয়োজনে আজ প্রকাশিত হলো সেই মহান জুলাই বিপ্লবের প্রথম প্রহর—১ ও ২ জুলাইয়ের অবিনাশী দ্রোহের গাথা।
শৃঙ্খল ভাঙার গান: ১ ও ২ জুলাইয়ের বিপ্লবী পদধ্বনি
৫ জুনের এক প্রহসনমূলক আইনি আদেশে যখন এদেশের মেধা ও যোগ্যতার কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার আয়োজন করা হলো, তখনই বাংলার ছাত্রসমাজ বুঝে নিয়েছিল—এ লড়াই শুধু কোটার বিরুদ্ধে নয়, এ লড়াই আসলে আত্মমর্যাদা আর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। পুরো জুন মাস জুড়ে যে ক্ষোভের আগুন তুষের আগুনের মতো জ্বলছিল, ১ জুলাই এসে তা এক প্রলয়ংকরী দাবদাহে রূপ নিল। ঢাকার আকাশ তখন মেঘলা, কিন্তু তরুণদের চোখ ছিল আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলজ্বলে। তারা আদালতের অলিন্দে নয়, রাজপথের ফয়সালায় বিশ্বাসী হয়ে নেমে এল জনসমুদ্রে।
১ জুলাই, ২০২৪: ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর জন্ম এবং দ্রোহের প্রথম স্ফুলিঙ্গ
সেদিন ভোরের আলো ফোটার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিচঢালা সড়কগুলো এক ভিন্ন সুর সাধতে শুরু করে। সেটি ছিল শৃঙ্খল ভাঙার সুর। অপরাজেয় বাংলা আর সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে একে একে জড়ো হতে থাকে শত, সহস্র বুক। কারো চোখে ভয় নেই, আছে কেবল অধিকার আদায়ের তীব্র ব্যাকুলতা।
- ঐতিহাসিক ব্যানার ও অবিনাশী প্রত্যয়: এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে একটি নাম ধারণের জন্য—‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। সাধারণ শিক্ষার্থীদের বুক চিরে জন্ম নেওয়া এই প্ল্যাটফর্মটিই পরবর্তীতে এক দফার মূল কাণ্ডারিতে পরিণত হয়েছিল।
- ক্যাম্পাসের বুক চিরে প্রথম গর্জন: রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ থেকে যখন প্রথম স্লোগান উঠল—“কোটা না মেধা? মেধা মেধা!”, সেই স্লোগানের প্রতিধ্বনি নীলক্ষেত আর শাহবাগ পেরিয়ে কাঁপন ধরাল গণভবনের দেয়ালে।
- অখণ্ড বাংলার এক সুর: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দ্রোহের আগুন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়। জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরগুলো ক্লাস-পরীক্ষার চিরচেনা কোলাহল ভুলে রূপান্তরিত হলো এক একটি বিপ্লবী দুর্গে। ছাত্ররা একযোগে ঘোষণা করল ছাত্র ধর্মঘট। এটি কোনো সাধারণ ধর্মঘট ছিল না, এটি ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ অবাধ্যতার প্রথম ইশতেহার।
২ জুলাই, ২০২৪: অবরুদ্ধ রাজধানী এবং স্বৈরাচারের সিংহাসনে প্রথম কম্পন
১ জুলাই যদি হয় শপথের দিন, তবে ২ জুলাই ছিল সেই শপথকে রাজপথে ফলপ্রসূ করার দিন। তরুণরা বুঝতে পেরেছিল, শুধু ক্যাম্পাসের ভেতর চিৎকার করে এই বধির এবং অহংকারী শাসকের ঘুম ভাঙানো যাবে না। তাই তারা বুকের তাজা রক্ত আর অদম্য সাহস নিয়ে রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিল।
- ঢাকার চাকা স্তব্ধ করার মহড়া: দুপুরের সূর্য যখন মাথার ওপর, ঠিক তখনই মিছিলের পর মিছিল এসে আছড়ে পড়ল ঢাকার হৃৎপিণ্ড—শাহবাগ মোড়ে। নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে শুরু করে প্রতিটি মোড়ে তরুণরা গড়ে তুলল মানবপ্রাচীর। থমকে গেল ঢাকার চাকা, স্থবির হয়ে পড়ল স্বৈরাচারের ক্ষমতার দম্ভ।
- মহাসড়কে মহাসংগ্রাম: ঢাকার বাইরে সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরুদ্ধ করে দাঁড়াল জাহাঙ্গীরনগরের অকুতোভয় সন্তানরা। অন্যদিকে, পদ্মাপাড়ের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা নিজেদের বুকের পাটা দিয়ে রেললাইন অবরুদ্ধ করে বিচ্ছিন্ন করে দিল উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ। সারা দেশ যেন এক সমস্বরে গেয়ে উঠল—“লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই।“
- স্বৈরাচারের অহংকার ও অবজ্ঞার জবাব: এই প্রবল গণজোয়ার দেখেও অহংকারে অন্ধ শেখ হাসিনা ও তার চামচারা তখনো আন্দোলনকে ‘আদালতের বিষয়’ বলে উপহাস করছিল। তারা ভাবেনি, এই তরুণরা আদালতের পরোয়ানা মানে না; তারা নিজেদের অধিকারের পরোয়ানা নিজেদের রক্ত দিয়ে লিখতে জানে।
প্রথম পর্বের বিপ্লবী উপাখ্যান: ৫ আগস্টের অবিনাশী ভিত্
১ ও ২ জুলাইয়ের এই মহান জাগরণ কেবল সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে চেপে রাখা ফ্যাসিবাদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস থেকে মুক্তি পাওয়ার এক আদিম ও অকৃত্রিম আকুতি। এই দুই দিনেই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, রিকশাচালক থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত অভিভাবক—সবাই তরুণের চোখে স্বৈরাচারমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন।
১ ও ২ জুলাইয়ের রাজপথে তরুণদের পায়ের যে ছাপ পড়েছিল, সেই ছাপই পরবর্তীতে ৫ আগস্টের (৩৬ জুলাইয়ের) সেই ঐতিহাসিক লং মার্চে রূপ নেয়, যার তোড়ে খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়ে খুনি শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। এই দুই দিন ছিল এক মহাবিপ্লবের প্রসববেদনা, যা বাঙালিকে এনে দিয়েছিল দ্বিতীয় স্বাধীনতার আস্বাদ।
(চলবে… আগামী পর্বে পড়ুন: ৩ থেকে ১০ জুলাইয়ের রক্তঝরা দিনলিপি ও ‘বাংলা ব্লকেড’)
মোঃ আলফাজ উদ্দিন-সম্পাদক,দৈনিক প্রান্তিক 
























