আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে তখন যেন একমুখী ফুটবল। বল স্পেনের পায়ে, আক্রমণ স্পেনের, সুযোগ স্পেনের। পেদ্রি, ফেরান তোরেস, মিকেল ওয়ারজাবাল, আইমেরিক লাপোর্তে—একটার পর একটা আক্রমণ শানাচ্ছেন। বেঞ্চ থেকে নেমেছেন বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামালও। কিন্তু গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এমন একজন, যিনি যেন একাই পুরো একটি জাতির স্বপ্ন পাহারা দিচ্ছিলেন।
তার নাম ভোজিনহা।
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে কেপ ভার্দে যা করেছে, সেটি শুধু একটি ড্র নয়; এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় প্রতিরোধের গল্প। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে ০-০ গোলে আটকে দিয়ে আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচয় ঘোষণা করেছে জোরালোভাবে।
পুরো ম্যাচে প্রায় ৭৫ শতাংশ বল দখলে রেখেছিল স্পেন। তারা নেয় ২৭টি শট, যার মধ্যে ৭টি ছিল লক্ষ্যে। কিন্তু প্রতিবারই সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে তিনি স্প্যানিশ তারকাদের হতাশায় ডুবিয়েছেন। ম্যাচ শেষে ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’-এর পুরস্কারও উঠেছে তার হাতেই।
প্রথমার্ধেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন ভোজিনহা। ফেরান তোরেসের জোরালো শট, লাপোর্তের হেড, ওয়ারজাবালের কাছ থেকে আসা নিশ্চিত গোল—সবকিছুই রুখে দেন তিনি। প্রতিটি সেভের সঙ্গে বাড়তে থাকে স্পেনের অস্থিরতা, আর কেপ ভার্দের আত্মবিশ্বাস।
যখন স্পেনের কোচ শেষ ভরসা হিসেবে লামিন ইয়ামালকে মাঠে নামালেন, তখনও বদলায়নি দৃশ্যপট। স্পেন আক্রমণ করেছে, কিন্তু গোল আসেনি। বরং শেষদিকে কেপ ভার্দেও পাল্টা আক্রমণে চমকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এই ম্যাচ শুধু ফলাফলের জন্য নয়, ইতিহাসের জন্যও স্মরণীয়। স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামার সময় ভোজিনহার বয়স ছিল ৪০ বছর ১২ দিন। এর মাধ্যমে তিনি পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে অভিষেক হওয়া ফুটবলারের রেকর্ড গড়েছেন। এতদিন এই রেকর্ড ছিল কানাডার সাবেক অধিনায়ক আতিবা হাচিনসন-এর দখলে।
অবশ্য বিশ্বকাপে সর্বকালের সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হওয়ার রেকর্ড এখনও মিসরের কিংবদন্তি এসাম এল হাদারির দখলে। ২০১৮ বিশ্বকাপে তিনি ৪৫ বছর বয়সে খেলেছিলেন। তবে অভিষেকের রেকর্ড এখন ভোজিনহার।
স্পেনের মতো ফুটবল পরাশক্তির বিপক্ষে গোল না খেয়ে ম্যাচ শেষ করে ভোজিনহা আরও একটি অনন্য কীর্তি গড়েছেন। বিশ্বকাপ অভিষেকে সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলরক্ষক হিসেবে ক্লিন শিট রাখার গৌরবও এখন তার।
ম্যাচ শেষে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। সতীর্থরা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেন। কারণ তারা জানতেন, এটি শুধু একটি পয়েন্ট নয়; এটি কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই দেশের প্রথম পয়েন্ট এনে দিয়েছেন ভোজিনহা।
ফুটবলপ্রেমীদের চোখেও এই ম্যাচ হয়ে উঠেছে বিশ্বকাপের প্রথম বড় রূপকথা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাতারাতি ভাইরাল হয়ে গেছেন ভোজিনহা। বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম তাকে আখ্যা দিয়েছে ‘ওয়ান-ম্যান ওয়াল’ বা ‘একক প্রতিরোধের দেয়াল’ হিসেবে।
আটলান্টার গরম দুপুরে স্পেনের তারকারা আলো ছড়াতে পারেননি। আলোটা পুরোটা কেড়ে নিয়েছেন একজন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক। তিনি প্রমাণ করে দিলেন, বিশ্বকাপ শুধু শক্তিধরদের মঞ্চ নয়; এটি বিশ্বাস, সাহস, ধৈর্য ও অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার মঞ্চও।
কেপ ভার্দের ইতিহাসে এই দিনটি লেখা থাকবে সোনালি অক্ষরে। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে থাকবেন একজন মানুষ—ভোজিনহা।
সেই গল্পের নতুন নাম—ভোজিনহার প্রাচীর।
স্পোর্টস ডেক্স- দৈনিক প্রান্তিক। 
























