Dhaka ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজীপুরে আবাসিক হোটেলে স্ত্রীকে হত্যা, ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই স্বামী গ্রেপ্তার

মনিরুল ইসলাম , বিশেষ প্রতিবেদক (ক্রাইম) দৈনিক প্রান্তিক।

গাজীপুর মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে স্ত্রী শান্তা বেগম (৩৩) হত্যাকাণ্ডের রহস্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী সাইফুল ইসলামকে রাজধানীর দক্ষিণখান থানার ফায়দাবাদ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানের সময় তাঁর কাছ থেকে নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়।

পিবিআই জানায়, মঙ্গলবার (২২ জুলাই) রাতে বাসন থানার চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার ‘ই-ভ্যালি’ আবাসিক হোটেলের ৩০৭ নম্বর কক্ষ থেকে শান্তা বেগমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরপরই পিবিআই গাজীপুর জেলা একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করে। হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং অভিযুক্তের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা মহানগরের দক্ষিণখান থানার ফায়দাবাদ ট্রান্সমিটার মোড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁর কাছ থেকে নিহত শান্তা বেগমের মোবাইল ফোন উদ্ধার করে জব্দ করা হয়।

পিবিআই জানায়, অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের নির্দেশনা এবং গাজীপুর জেলা পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিরামহীন তদন্তের ফলেই এত দ্রুত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে।

দাম্পত্য কলহের জেরে হত্যাকাণ্ড

তদন্তে জানা গেছে, গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় চাকরির সময় সাইফুল ইসলাম ও শান্তা বেগমের পরিচয় হয়। প্রায় তিন মাসের সম্পর্কের পর তারা বিয়ে করেন। তবে উভয়ের আগের সংসার, সন্তান এবং পারিবারিক বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের মধ্যে মতবিরোধ ও অবিশ্বাস চলছিল।

পিবিআইর তথ্যমতে, সাইফুল ইসলামের আগের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। অন্যদিকে শান্তা বেগমেরও আগের সংসারের দুই সন্তান ছিল। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে প্রায়ই দাম্পত্য কলহ হতো।

ঘটনার দিন শান্তা বেগম ফোন করে সাইফুল ইসলামকে গাজীপুরে আসতে বলেন। পরে তারা চান্দনা চৌরাস্তার ওই আবাসিক হোটেলের ৩০৭ নম্বর কক্ষে ওঠেন। সেখানে পূর্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সাইফুল প্রথমে স্ত্রীকে থাপ্পড় মারেন। পাল্টা প্রতিরোধের পর তিনি ধারালো অস্ত্র দিয়ে শান্তা বেগমের গলা ও বুকে একাধিক আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে নিহতের মোবাইল ফোন ও পরিচয়পত্র নিয়ে অভিযুক্ত হোটেল থেকে পালিয়ে যান।

তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি এখনো উদ্ধার করা যায়নি। এ ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।

প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তে দ্রুত সাফল্য

সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে ক্রাইম সিন টিম পাঠানো হয় এবং পৃথক একটি তদন্ত দল ছায়া তদন্ত শুরু করে। সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল তথ্য, গোয়েন্দা তথ্য এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নিহতের পরিচয় শনাক্ত, প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরও জানান, মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আলামত সংগ্রহ ও সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলামকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁর জিজ্ঞাসাবাদ, উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন, হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম গ্রেপ্তার

গাজীপুরে আবাসিক হোটেলে স্ত্রীকে হত্যা, ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই স্বামী গ্রেপ্তার

Update Time : ০৩:৪৫:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

মনিরুল ইসলাম , বিশেষ প্রতিবেদক (ক্রাইম) দৈনিক প্রান্তিক।

গাজীপুর মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে স্ত্রী শান্তা বেগম (৩৩) হত্যাকাণ্ডের রহস্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী সাইফুল ইসলামকে রাজধানীর দক্ষিণখান থানার ফায়দাবাদ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানের সময় তাঁর কাছ থেকে নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়।

পিবিআই জানায়, মঙ্গলবার (২২ জুলাই) রাতে বাসন থানার চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার ‘ই-ভ্যালি’ আবাসিক হোটেলের ৩০৭ নম্বর কক্ষ থেকে শান্তা বেগমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরপরই পিবিআই গাজীপুর জেলা একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করে। হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং অভিযুক্তের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা মহানগরের দক্ষিণখান থানার ফায়দাবাদ ট্রান্সমিটার মোড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁর কাছ থেকে নিহত শান্তা বেগমের মোবাইল ফোন উদ্ধার করে জব্দ করা হয়।

পিবিআই জানায়, অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের নির্দেশনা এবং গাজীপুর জেলা পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিরামহীন তদন্তের ফলেই এত দ্রুত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে।

দাম্পত্য কলহের জেরে হত্যাকাণ্ড

তদন্তে জানা গেছে, গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় চাকরির সময় সাইফুল ইসলাম ও শান্তা বেগমের পরিচয় হয়। প্রায় তিন মাসের সম্পর্কের পর তারা বিয়ে করেন। তবে উভয়ের আগের সংসার, সন্তান এবং পারিবারিক বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের মধ্যে মতবিরোধ ও অবিশ্বাস চলছিল।

পিবিআইর তথ্যমতে, সাইফুল ইসলামের আগের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। অন্যদিকে শান্তা বেগমেরও আগের সংসারের দুই সন্তান ছিল। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে প্রায়ই দাম্পত্য কলহ হতো।

ঘটনার দিন শান্তা বেগম ফোন করে সাইফুল ইসলামকে গাজীপুরে আসতে বলেন। পরে তারা চান্দনা চৌরাস্তার ওই আবাসিক হোটেলের ৩০৭ নম্বর কক্ষে ওঠেন। সেখানে পূর্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সাইফুল প্রথমে স্ত্রীকে থাপ্পড় মারেন। পাল্টা প্রতিরোধের পর তিনি ধারালো অস্ত্র দিয়ে শান্তা বেগমের গলা ও বুকে একাধিক আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে নিহতের মোবাইল ফোন ও পরিচয়পত্র নিয়ে অভিযুক্ত হোটেল থেকে পালিয়ে যান।

তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি এখনো উদ্ধার করা যায়নি। এ ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।

প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তে দ্রুত সাফল্য

সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে ক্রাইম সিন টিম পাঠানো হয় এবং পৃথক একটি তদন্ত দল ছায়া তদন্ত শুরু করে। সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল তথ্য, গোয়েন্দা তথ্য এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নিহতের পরিচয় শনাক্ত, প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরও জানান, মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আলামত সংগ্রহ ও সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলামকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁর জিজ্ঞাসাবাদ, উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন, হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।