হায় কারবালা! হায় সেই মরুপ্রান্তর!
যে ভূমির বুকে একদিন মানবতার ইতিহাসের সর্বাধিক করুণ অধ্যায় রচিত হইয়াছিল। যে বালুকণা অশ্বের পদাঘাতে উড়িয়াছিল, সেই বালুকণাই সেদিন ধারণ করিয়াছিল শহীদের রক্ত, মায়ের অশ্রু আর পিতার বুকফাটা বেদনা।
৬১ হিজরির ১০ মহররম।
আকাশে সূর্য জ্বলিতেছে, কিন্তু কারবালার তাঁবুগুলোর ভিতরে নেমে এসেছে এক অন্ধকার শোকের ছায়া। ফোরাত নদী নিকটে, অথচ তৃষ্ণার্ত পরিবারটির জন্য সেই জল যেন মরীচিকা। শিশুদের কান্না, নারীদের দীর্ঘশ্বাস আর আহত হৃদয়ের আর্তনাদে বাতাস ভারী হইয়া উঠিয়াছে।
সেই তাঁবুর এক কোণে শুয়ে আছে এক নিষ্পাপ শিশু—আলী আসগর।
ছয় মাসের সেই কোমল প্রাণ, যে যুদ্ধ জানে না, রাজনীতি জানে না, শত্রু-মিত্রের পার্থক্য জানে না। সে শুধু জানে মাতৃস্নেহ, পিতার কোল আর জীবনের মধুর আহ্বান। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তৃষ্ণায় শিশুটির কণ্ঠ শুকাইয়া গিয়াছিল; তখন পিতা হোসাইন (রা.) তাঁহাকে কোলে তুলে নেন।
হায় নিয়তি!
যে পিতা সন্তানের মুখে হাসি দেখিবার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন, সেই পিতাকেই সেদিন সন্তানের জন্য এক ফোঁটা পানির আবেদন করিতে হইল।
ইমাম হোসাইন (রা.) শিশুটিকে কোলে লইয়া কারবালার ময়দানে দাঁড়াইলেন। তাঁহার চোখে ছিল পিতার অশ্রু, হৃদয়ে ছিল অসীম বেদনা। তিনি বলিতেছিলেন—
“এই শিশুর কী অপরাধ? সে তো যুদ্ধ করিতে আসে নাই, সে তো কারো বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে নাই।”
কিন্তু ইতিহাসের সেই নির্মম মুহূর্তে দয়ার দ্বার খুলিল না।
প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনায় আসে—শিশু আলী আসগর তীরবিদ্ধ হয়ে পিতার কোলেই শাহাদাত বরণ করেন।
হায়!
সে দৃশ্য দেখিয়া যদি পাথরও কাঁদিত, তবে তাহা অস্বাভাবিক হইত না।
একদিকে পিতার বুক, অন্যদিকে শিশুর নিথর দেহ—মাঝখানে দাঁড়াইয়া আছে এক পৃথিবীর সমস্ত শোক।
ইমাম হোসাইন (রা.)-এর হৃদয় তখন কেমন ছিল—তা কেবল আল্লাহই জানেন। যে হাতে তিনি শিশুকে আদর করিতেন, সেই হাতেই তাঁহাকে বিদায়ের প্রস্তুতি নিতে হইল। যে চোখে সন্তানের ভবিষ্যৎ দেখিবার কথা ছিল, সেই চোখে সেদিন দেখিলেন মৃত্যুর নির্মম ছায়া।
কারবালার মাটি সেদিন শুধু একজন শিশুর রক্ত গ্রহণ করে নাই; গ্রহণ করিয়াছিল এক পিতার অসীম ধৈর্যের পরীক্ষা। সেই ক্ষুদ্র শিশুর শাহাদাত ইতিহাসের বুকে এক গভীর প্রশ্ন রেখে গেল—ক্ষমতার উন্মত্ততা মানুষকে কত দূর অমানবিক করিতে পারে?
অবশেষে সেই দিন শেষ হইল।
সূর্য অস্ত গেল, কিন্তু কারবালার কান্না অস্ত গেল না।
হোসাইন, তাঁর সাথীরা এবং শিশু আসগরের স্মৃতি যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয়ে বেদনার প্রদীপ জ্বালাইয়া রাখিল।
কারবালা তাই শুধু একটি মরুভুমির নাম নহে—
এ এক অশ্রুর মহাসাগর, এক ত্যাগের মহাকাব্য, এক অবিনশ্বর শিক্ষা।
হায় কারবালা!
তোমার বালুরাশিতে আজও যেন শোনা যায় এক শিশুর করুণআর্তি—
আর সেই আর্তির মধ্য দিয়াই মানবতার বিবেক বারবার জাগিয়া উঠে।
মোঃআলফাজ উদ্দিন-সম্পাদক,দৈনিক প্রান্তিক। 






















