নতুন দানকর বিধান ও এ-চালান জটিলতায় কমেছে দলিল রেজিস্ট্রি, এনবিআরের স্পষ্টীকরণ
নতুন অর্থবছর থেকে হেবা (উপহার) ও দান দলিল নিবন্ধনে দানকর আদায় এবং অটোমেটেড চালান (এ-চালান) বাধ্যতামূলক হওয়ায় দেশের বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধনে জটিলতা দেখা দিয়েছে। নতুন বিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব এবং এ-চালান ব্যবস্থার কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে কয়েক দিন ধরে অনেক এলাকায় হেবা ও দান দলিল নিবন্ধন কার্যত বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে বিক্রয় দলিল নিবন্ধনের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন বিধান কার্যকরের পর অনেক সেবাগ্রহীতা ও দলিল লেখক প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত না থাকায় দলিল নিবন্ধন কমে এসেছে। ফলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে সামগ্রিক নিবন্ধনের হার আগের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে জটিলতা দূর করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত মঙ্গলবার একটি স্পষ্টীকরণমূলক সার্কুলার জারি করেছে। এতে দানকর আদায়ের বিধান, এ-চালানের ব্যবহার এবং কোন ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরে কী কর প্রযোজ্য হবে—সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, এই ব্যাখ্যার ফলে বিভ্রান্তি অনেকটাই দূর হবে এবং দলিল নিবন্ধন স্বাভাবিক হবে।
এনবিআরের সার্কুলারে বলা হয়েছে, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১২৫ এবং উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৬ অনুযায়ী সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারে কর সংগ্রহের বিধান রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ধারা ১২৫-এ নতুন উপধারা (২ক) সংযোজন করা হয়েছে, যেখানে হেবা বা দানের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দানকর আদায়ের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ বিধান অনুযায়ী, কেবল হেবা বা দানের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা দানকর আইন, ১৯৯০ অনুসারে প্রযোজ্য হারে দানকর এ-চালানের মাধ্যমে আদায় করবেন। এই কর পরিশোধের দায়িত্ব হেবাদাতা বা দানকারীর। তবে এ ক্ষেত্রে উৎসে কর প্রযোজ্য হবে না।
অন্যদিকে, ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দানকর প্রযোজ্য নয়। এ ধরনের নিবন্ধনে আগের নিয়ম অনুযায়ী কেবল প্রযোজ্য উৎসে কর পরিশোধ করতে হবে।
নতুন বিধানে আরও বলা হয়েছে, দলিল নিবন্ধনের জন্য জমির ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত পরিশোধ করা থাকতে হবে। এছাড়া পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকার বিক্রয় কবলা, বায়নানামা, লিজ এবং পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ (পিএসআর) জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় নথি না থাকলে সংশ্লিষ্ট দলিল নিবন্ধন করা হবে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থায় আয়কর ও দানকর নির্ধারিত অর্থনৈতিক কোডে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অনুকূলে এ-চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হবে এবং চালানের কপি দলিলের সঙ্গে দাখিল করতে হবে। তবে একবার এ-চালানের মাধ্যমে অর্থ জমা হয়ে গেলে কোনো কারণে দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন না হলে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ না থাকায় আগে সব কাগজপত্র ও নিবন্ধনের যোগ্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরই অর্থ জমা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে কয়েকজন জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার জানিয়েছেন, নতুন বিধান নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তারা স্পষ্ট করেছেন, পিতা-মাতা থেকে সন্তান, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কিংবা একই মায়ের গর্ভজাত ভাই-বোনের মধ্যে সম্পত্তি হেবা করার ক্ষেত্রে আগের মতোই দানকর থেকে অব্যাহতি বহাল রয়েছে। তবে এ অব্যাহতি দানকর আইন, ১৯৯০-এ নির্ধারিত সীমার মধ্যেই প্রযোজ্য হবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনের বিধান অনুযায়ী দানকর পরিশোধ করতে হবে।
নতুন বিধান বাস্তবায়নের শুরুতে প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতা থাকলেও এনবিআরের স্পষ্টীকরণের পর দলিল নিবন্ধন কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন-সম্পাদক,দৈনিক প্রান্তিক। 






















