কাকে আমরা পাগল বলি? যে মানুষটি ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে অথচ সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের ক্ষতকে ভাষা দেয়, নাকি সেই সমাজকে, যারা একজন অসাধারণ প্রতিভাকে বোঝার বদলে তাকে উপহাসের পাত্র বানায়?
মোঃ আলফাজ উদ্দিন
সম্পাদক- ˆদৈনিক প্রান্তিক
“আমি তার উপেক্ষার ভাষা আমি তার ঘৃণার আক্রোশ”—বাংলা কবিতায় প্রেমের এমন আত্মদগ্ধ উচ্চারণ খুব কমই শোনা গেছে| এই একটি পঙক্তির মধ্যেই যেন জমাট বেঁধে আছে প্রত্যাখ্যাত ভালোবাসার দীর্ঘশ্বাস, নিঃসঙ্গতার গোপন আর্তি এবং আত্মবিনাশী এক প্রেমিকসত্তার সমগ্র ইতিহাস| বাংলা সাহিত্যে প্রেম বহুবার এসেছে—রবীন্দ্রনাথের পূজার অর্ঘ্যে, জীবনানন্দের নিঃসঙ্গ বিষণ্নতায়, শক্তির বিদ্রোহে কিংবা সুনীলের নাগরিক আকাঙ্ক্ষায়| কিন্তু‘ প্রেমকে নিজের জীবনের রক্তক্ষরণে এমন নির্মমভাবে ধারণ করেছেন খুব কম কবিই, যেমন করেছিলেন কবি বিনয় মজুমদার|
বিনয় মজুমদারকে দীর্ঘদিন ধরে ‘পাগল কবি’ বলে অভিহিত করা হয়েছে| অথচ এই অভিধার ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের নির্মম অমানবিকতা| যে মানুষটি প্রেমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, যিনি সমাজের প্রচলিত ছাঁচে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেননি, যিনি একাকীত্বকে নিজের সৃষ্টির অনিবার্য উপাদানে পরিণত করেছিলেন—তাঁকেই আমরা সহজভাবে ‘পাগল’ বলে দূরে সরিয়ে দিয়েছি| প্রশ্ন হলো—কাকে আমরা পাগল বলি? যে মানুষটি ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে অথচ সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের ক্ষতকে ভাষা দেয়, নাকি সেই সমাজকে, যারা একজন অসাধারণ প্রতিভাকে বোঝার বদলে তাকে উপহাসের পাত্র বানায়?
বিনয় মজুমদারের জীবন ছিল অনবরত আঘাত, অপমান এবং বঞ্চনার ইতিহাস| জীবনের এক পর্যায়ে তাঁকে বহুবার মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়| লুম্বিনী পার্ক হাসপাতাল, গোবরা মানসিক হাসপাতাল—এইসব নাম তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়| তাঁকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়েছিল বারবার| এমনকি কোথাও কোথাও তাঁকে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাওয়ার কথাও জানা যায়| কিন্তু ‘ বিস্ময়কর হলো—এই সমস্ত দুঃসহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও তাঁর সৃষ্টিশক্তি বিনষ্ট হয়নি| বরং হাসপাতালের ভেতরেই তিনি লিখেছেন ‘হাসপাতালে লেখা গুচ্ছ’, যা পরে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়| অর্থাৎ যাকে সমাজ ‘পাগল’ বলে বাতিল করতে চেয়েছিল, সেই মানুষটিই তাঁর কবিতার শক্তিতে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে উঠেছেন|
এই জায়গাতেই বিনয় মজুমদার হয়ে ওঠেন এক ব্যতিক্রমী শিল্পী| কারণ তাঁর কবিতা নিছক শব্দের অলংকার নয়; বরং গভীর অস্তিত্বসংকটের ভাষা| তাঁর প্রেম কেবল কোনো নারীকে কেন্দ্র করে জন্ম নেওয়া আবেগ নয়; বরং প্রেম তাঁর কাছে ছিল জীবনদর্শন, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং মানবিক অপূর্ণতার নির্মম উপলব্ধি|
এই প্রেমের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন গায়ত্রী চক্রবর্তী—পরবর্তীকালে বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক| গায়ত্রীকে ঘিরেই জন্ম নেয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রেমের কাব্যগ্রন্থ “ফিরে এসো, চাকা’| এই কাব্যের কবিতাগুলো সংখ্যায় চিহ্নিত হলেও আসলে সেগুলো এক প্রেমিক হৃদয়ের দিনলিপি| প্রত্যেকটি কবিতায় আছে স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাখ্যান, শরীরী টান, অভিমান এবং না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস|
বিনয়ের প্রেম ছিল গভীর অথচ অসম্পূর্ণ| তাঁর নিজের ভাষাতেই—“সতত বিশ্বাস হয়, প্রায় সব আয়োজনই হয়ে গেছে, তবু / কেবল নির্ভুলভাবে সম্পর্ক¯ স্থাপন করা যায় না এখনো|” এই উচ্চারণ কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতার নয়; বরং আধুনিক মানুষের সম্পর্কহীনতারও এক গভীর দলিল| মানুষ যত আধুনিক হয়েছে, সম্পর্ক তত জটিল হয়েছে| বিশ্বাসের জায়গায় এসেছে সংশয়, অনুভূতির জায়গায় এসেছে কৃত্রিমতা| ফলে প্রেম আর সহজ থাকেনি| বিনয় এই জটিল সময়ের সন্তান বলেই তাঁর কবিতায় প্রেম কখনো শান্ত আশ্রয় নয়; বরং অস্থিরতা, অপচয় এবং অন্তর্গত ক্ষয়ের প্রতীক|
তাঁর কবিতায় প্রেম কখনো ‘আলেখ্য’, কখনো ‘পালিত পায়রা’, কখনো ‘উপবিষ্ট মশা উড়ে গেলে ঈষৎ সঙ্গীতময়’ হয়ে ওঠে| এই চিত্রকল্পগুলো বাংলা কবিতায় সম্পূর্ণ অভিনব| তিনি প্রেমকে কেবল রোমান্টিক সৌন্দর্যে দেখেননি; বরং প্রেমের শরীরী আকর্ষণ, ক্ষয়, ক্লান্তি এবং মানসিক বিভ্রমকেও কবিতার উপাদান করেছেন| তাই তাঁর কবিতায় যেমন জ্যামিতিক শৃঙ্খলা আছে, তেমনি আছে ˆজৈবিক উত্তাপ|
বিনয় মজুমদারের কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর উপমা ও চিত্রকল্প নির্মাণ| “চতুর্দিকে সরস পাতার / মাঝে থাকা শিরীষের বিশুষ্ক ফলের মতো আমি / জীবনযাপন করি”—এই কয়েকটি পঙ&ক্তিতেই ধরা পড়ে তাঁর সমগ্র অস্তিত্ববোধ| চারপাশে জীবন প্রবাহিত হচ্ছে, অথচ তিনি নিজে শুকিয়ে যাওয়া এক ফলের মতো নিঃসঙ্গ| এই নিঃসঙ্গতা কেবল প্রেমহীনতার নয়; বরং সমাজচ্যুত এক মানুষের অন্তর্গত শূন্যতার প্রতীক|
তাঁর প্রেম কখনো পূজার পর্যায়ে পৌঁছায়নি| রবীন্দ্রনাথের প্রেম যেমন দুঃখের আলোয় পূজাময় হয়ে ওঠে, বিনয়ের প্রেম তেমন নয়| তাঁর প্রেম বাস্তবের ধুলো, কাদা, শরীরী আর্তনাদ এবং অপূর্ণতার মধ্যে ভেঙে পড়ে| তবু সেই ভাঙনের মধ্যেই তিনি সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ শিল্প | “করুণ চিলের মতো সারাদিন, সারাদিন ঘুরি”—এই উচ্চারণে যেমন আছে এক আহত মানুষের অন্তর্গত হাহাকার, তেমনি “প্লাবনের মতো একবার এস ফের”—এ আছে ভালোবাসার শেষ আর্তি|
বিনয়ের কবিতায় শরীর ও প্রেমের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| তিনি জানতেন, প্রেমকে সম্পূর্ণভাবে শরীর থেকে আলাদা করা যায় না| তাই তিনি লিখেছেন—“মানুষের কিন্তু‘ মাংসরন্ধনকালীন ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে|” এই উচ্চারণ নিছক শরীরবাদ নয়; বরং মানবিক আকর্ষণের গভীর বাস্তবতা| প্রেম যতই আধ্যাত্মিক হোক, তার শিকড় শরীরের ভেতরেও প্রোথিত| কিন্তু এই শরীরী আকর্ষণই অনেক সময় প্রেমকে ক্ষয় করে, তাকে অপূর্ণ করে তোলে| ফলে প্রেম পরিণত হয় এক অনিবার্য অপচয়ে|
এই অপচয়ের বোধই তাঁর কবিতাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে| “হে আলেখ্য, অপচয় চিরকাল পৃথিবীতে আছে”—এই উপলব্ধি শুধু প্রেমের নয়; বরং সমগ্র জীবনের| পৃথিবীতে যেমন অধিকাংশ বৃষ্টির জল মাটিতে শুষে যায়, তেমনি অধিকাংশ ভালোবাসাও হারিয়ে যায় অপ্রাপ্তির অন্ধকারে| তবু মানুষ ভালোবাসে| কারণ ভালোবাসা ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব পূর্ণ হয় না|
বিনয় মজুমদারের জীবন আমাদের আরেকটি কঠিন সত্য শেখায়—সামাজিক ¯স্বীকৃতি সবসময় সত্যের মাপকাঠি নয়| একজন মানুষকে ‘পাগল’ বলে চিহ্নিত করা খুব সহজ, কিন্তু তাঁর ভেতরের যন্ত্রণাকে বোঝা খুব কঠিন| বিনয় সেই কঠিন বোঝাপড়ার কবি| তিনি ছিলেন প্রেমে আহত, সমাজে অবহেলিত, কিন্তু‘ শিল্পে অনন্য|
আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে বিনয় মজুমদারকে নতুন করে পাঠ করা জরুরি| কারণ আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে সম্পর্ক ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে উঠছে| মানুষ একে অপরের কাছে থেকেও ভীষণ দূরে সরে যাচ্ছে| ভালোবাসা ক্রমেই ভাসমান, সাময়িক এবং অনিশ্চিত হয়ে উঠছে| এই সময়ের মানুষের নিঃসঙ্গতা তাই বিনয়ের কবিতায় আশ্চর্যভাবে প্রতিফলিত হয়|
তাঁর কবিতায় আমরা শুধু এক প্রত্যাখ্যাত প্রেমিককে দেখি না; দেখি আধুনিক মানুষের ভেতরের শূন্যতা, আকাঙ্ক্ষা, অপচয় এবং আত্মদহন| দেখি এমন এক শিল্পীকে, যিনি ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে মহৎ শিল্পে রূপ দিয়েছেন| তাই তাঁকে কেবল ‘পাগল কবি’ বলা অন্যায়| তিনি ছিলেন প্রেম, প্রত্যাখ্যান, নিঃসঙ্গতা ও আত্মদহনের এক অনন্য মহাকাব্যিক শিল্পী—যার জীবনও কবিতা, আর কবিতাও এক অসীম আহত জীবন|
মোঃ আলফাজ উদ্দিন 





















