মোঃ আলফাজ উদ্দিন
গণ সাংবাদিক ও নাগরিক লেখক।
বাংলা সাহিত্যে হুমায়ুন আহমেদ “- এমন এক লেখক, যিনি মধ্যবিত্ত জীবনের হাসি, কান্না, সংকট, প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও স্বপ্নকে এত গভীর মানবিকতায় ধারণ করেছেন যে তাঁর রচনাজগৎ ধীরে ধীরে এক বিশাল সামাজিক মহাকাব্যে পরিণত হয়েছে। তিনি রাজা-বাদশাহর গল্প লেখেননি; লিখেছেন ভাঙা বারান্দা, অল্প আলোয় বসে থাকা মানুষ, সংসারের ক্লান্তি, বেতনের টানাপোড়েন, নিঃশব্দ প্রেম এবং একাকী মানুষের অন্তর্গত ভয়ের কথা।
তাঁর সাহিত্যিক শক্তি ছিল অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতায়। তিনি জানতেন বাংলা মধ্যবিত্ত জীবনের প্রকৃত নাটক কোথায় ঘটে—ড্রইংরুমের নিস্তব্ধতায়, রাতের খাবারের টেবিলে, বৃষ্টির দিনে চুপচাপ জানালার পাশে বসে থাকা মানুষের চোখে, কিংবা পরিবারের অভিমানী নীরবতার মধ্যে।
“নন্দিত নরকে”, “শঙ্খনীল কারাগার”, “বহুব্রীহি”, “দেয়াল”, “লীলাবতী”—প্রতিটি রচনায় তিনি মধ্যবিত্ত জীবনের একেকটি আলাদা মানসিক ভূগোল নির্মাণ করেছেন। তাঁর চরিত্ররা বড় কোনো বিপ্লব করে না; তারা বেঁচে থাকে, কষ্ট পায়, ভালোবাসে, হারিয়ে যায়—ঠিক সাধারণ মানুষের মতো। অথচ সেই সাধারণ জীবনই তাঁর কলমে অসাধারণ হয়ে ওঠে।
হুমায়ুন আহমেদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এই যে, তিনি বাংলা সাহিত্যে “সাধারণ মানুষ”-কে কেন্দ্রীয় নায়ক করে তুলেছেন। তাঁর চরিত্ররা অতিমানবিক নয়; বরং ভীষণ পরিচিত। হিমুর উদাস পথচলা, মিসির আলির যুক্তিনির্ভর মন, বাকের ভাইয়ের ট্র্যাজিক উপস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে তিনি এমন এক চরিত্রভুবন নির্মাণ করেছেন, যা পাঠকের ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।
কোথাও কেউ নেই নাটকের বাকের ভাইকে ঘিরে মানুষের আবেগ কিংবা আজ রবিবার-এর পারিবারিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম হাস্যরস প্রমাণ করে—তিনি কেবল লেখক ছিলেন না, তিনি মানুষের দৈনন্দিন আবেগের ভাষ্যকার ছিলেন।
তাঁর নাটকগুলো বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজের সাংস্কৃতিক দলিল। সেখানে অতিনাটকীয়তা নেই; আছে খুব চেনা বাস্তবতা। ছোট ছোট সংলাপ, নিরীহ হাস্যরস, হঠাৎ নেমে আসা বিষণ্ণতা—এসবই তাঁর নাট্যভাষাকে আলাদা করে তোলে।
সমালোচকরা প্রায়ই বলেন, তাঁর লেখায় পুনরাবৃত্তি আছে, অতিরিক্ত সরলতা আছে। কিন্তু এই সরলতাই তাঁর শক্তি। কারণ তিনি সাহিত্যকে দুর্বোধ্যতার দেয়াল থেকে নামিয়ে মানুষের ঘরের ভেতরে নিয়ে এসেছেন। তিনি পাঠককে মুগ্ধ করতে চাননি; বরং পাশে বসে গল্প বলতে চেয়েছেন।
বাংলা সাহিত্যে অনেক বড় লেখক আছেন, কিন্তু খুব কম লেখকই আছেন, যাঁদের চরিত্রগুলো বাস্তব জীবনের মানুষের মতো সমাজে ঘুরে বেড়ায়। হুমায়ুন আহমেদের চরিত্ররা ঠিক তেমনই—তারা বইয়ের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না; পাঠকের জীবনের অংশ হয়ে যায়।
এই কারণেই হুমায়ুন আহমেদ কেবল জনপ্রিয় লেখক নন; তিনি বাংলা মধ্যবিত্ত জীবনের মহাকাব্যিক কথক। তাঁর সাহিত্য একক কোনো সময়ের নয়—এটি বাঙালির পারিবারিক স্মৃতি, নীরব আবেগ ও জীবনের সাধারণ অথচ গভীর সৌন্দর্যের দীর্ঘস্থায়ী দলিল।
Reporter Name 





















