মোঃ আলফাজ উদ্দিন- সম্পাদক, দৈনিক প্রান্তিকঃ
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা ও যুদ্ধপরিস্থিতি নতুন এক কূটনৈতিক মোড়ে পৌঁছেছে। ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অবস্থান এবং “নিশ্চিত বিজয়”-এর ঘোষণা দিয়েছিলেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, সংঘাতের শেষ অধ্যায়ে এসে যুদ্ধের চেয়ে সমঝোতার পথেই ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশ এটিকে ওয়াশিংটনের “কৌশলগত পশ্চাদপসরণ” বলেও অভিহিত করছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপে জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য “সমঝোতা স্মারক” নিয়ে আলোচনা চলছে। এই সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ৩০ দিনের আলোচনা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ কেবল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির কূটনীতি নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সম্পৃক্ততা কমানোর কৌশলের অংশ। ওয়াশিংটন বুঝতে পেরেছে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে গোটা অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন এখন বড় আকারের সামরিক অভিযানের বদলে সীমিত প্রতীকী অবস্থান নিয়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে।
সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে গত মার্চে, যখন ইসরাইল ইরানের পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে ইরান কাতারের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস স্থাপনায় আঘাত হানে। এরপর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের আহ্বান জানালে সংঘাত ধীরে ধীরে স্থবির অবস্থায় পৌঁছায়।
এদিকে যুদ্ধবিরতি ও সম্ভাব্য শান্তিচুক্তিকে কেন্দ্র করে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। সোমবার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কাতারের রাজধানী দোহা সফর করেন। সেখানে তারা কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানির সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরানের প্রধান আলোচক হিসেবে গালিবাফ এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রতিনিধি দলে আরও রয়েছেন ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুলনাসের হেম্মাতি। ধারণা করা হচ্ছে, সম্ভাব্য চূড়ান্ত সমঝোতার অংশ হিসেবে বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের অর্থ ফেরতের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, দোহার বৈঠকে মূল গুরুত্ব পাচ্ছে দুটি বিষয়—হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কর্মসূচি। কারণ হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। এই প্রণালি ঘিরে নতুন কোনো সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে।
অন্যদিকে সম্ভাব্য এই সমঝোতা ইসরাইলের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ইসরাইলি সংবাদপত্র হারেৎজ এক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নেতানিয়াহুর প্রভাব আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পত্রিকাটির সামরিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন-তেহরান সমঝোতার সম্ভাব্য শর্তগুলো ইসরাইলের কৌশলগত স্বার্থের অনুকূলে নয়।
একজন মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক ফোনালাপের পর নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়ায় গভীর উদ্বেগের ছাপ দেখা গেছে। কারণ যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় ইরান আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অবস্থানে উঠে আসতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে যুদ্ধের ভাষার চেয়ে কূটনীতির ভাষাই ক্রমশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে চূড়ান্ত সমঝোতা আদৌ হবে কি না, কিংবা হলে সেটি কতটা স্থায়ী হবে—তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট, এই সংঘাতের পরিণতি শুধু ইরান-ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বিশ্বরাজনীতির শক্তির ভারসাম্যের ওপরও।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন-সম্পাদক, দৈনিক প্রান্তিকঃ 



















