Dhaka ০৭:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

“স্মৃতির করিডোরে চব্বিশের ক্ষত: এখনো শেষ হয়নি জুলাই”- আমীরে জামায়াত

“স্মৃতির করিডোরে চব্বিশের ক্ষত: এখনো শেষ হয়নি জুলাই”- আমীরে জামায়াত

মোঃ আলফাজ উদ্দিন, সম্পাদক –দৈনিক প্রান্তিক।


৮ আগস্ট,২০২৬:  রাজনীতির মঞ্চে কখনো কখনো একটি একক বাক্য গোটা জাতির মনস্তত্ত্বকে নাড়িয়ে দেয়। ২০২৬ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান যখন বললেন, “জুলাই এখনো শেষ হয়নি”, তখন তা কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা, রক্তক্ষরণ এবং এখনো অধরা থাকা স্বপ্নের এক জীবন্ত দলিল। ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক এক মর্মস্পর্শী স্থিরচিত্র প্রদর্শনী শেষে তাঁর এই মন্তব্য বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার এক গভীর প্রতিচ্ছবি।

স্মৃতির করিডোরে ইতিহাসের ক্ষত
মিন্টু রোডের প্রদর্শনীটি ফ্যাসিবাদের নির্মমতার বিরুদ্ধে এক পাক্ষিক ও চাক্ষুষ প্রতিবাদ। প্রদর্শনী কক্ষে ঝুলে থাকা প্রতিটি আলোকচিত্র যেন কথা বলছিল। সেখানে ছিল বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হওয়া তরুণের নিথর দেহ, সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে পিতার বোবা কান্না, আর রাজপথে বুক পেতে দেওয়া ছাত্র-জনতার অবিনাশী সাহস। এই আয়োজন দর্শককে মনে করিয়ে দেয়, আজ আমরা যে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তার পেছনে রয়েছে এক মহাসমুদ্র রক্ত। ডা. শফিকুর রহমান ঠিক এই জায়গাটিতেই আঘাত করেছেন—যেই স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের করাল গ্রাসে দেশ বছরের পর বছর পিষ্ট হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি রোধ করাই এই স্মারক প্রদর্শনীর মূল লক্ষ্য।

উপেক্ষিত ইতিহাস রাজনৈতিক সমীকরণ
তবে এই নান্দনিক ও আবেগঘন আয়োজনের সমান্তরালে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক সূক্ষ্ম বিতর্কের রেখাপাত ঘটেছে। প্রদর্শনীতে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের চিত্র ঠাঁই পেলেও, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে পরিচিত জিয়াউর রহমানের কোনো ভূমিকা বা চিত্র স্থান পায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই কৌশলগত অবস্থান দলটির নিজস্ব ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণেরই বহিঃপ্রকাশ। এই অনুপস্থিতি ডানপন্থী রাজনৈতিক বলয়ে এক নীরব অস্বস্তি ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা এই প্রান্তিক প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক।

জুলাইকেন শেষ হয়নি?
জামায়াত আমিরের বক্তব্যের মূল সুর ছিল ‘অধিকার ও আকাঙ্ক্ষা’। চব্বিশের জুলাইয়ের যে গণ-অভ্যুত্থান ছিল রাষ্ট্র সংস্কার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট। ডা. শফিকুর রহমানের দৃষ্টিতে, সেই ম্যান্ডেট বা আকাঙ্ক্ষা এখনো পুরোপুরি অধরা। যতদিন না সাধারণ মানুষের ঘরে চালের জোগান নিশ্চিত হচ্ছে, যতদিন না বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটছে, এবং যতদিন না একটি টেকসই ও বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠছে—ততদিন ক্যালেন্ডারের পাতা যতই উল্টাক না কেন, চেতনার ‘জুলাই’ কখনো শেষ হতে পারে না।


‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’—একটি চলমান লড়াইয়ের ইশতেহার। এটি ক্ষমতার মসনদে বসা নতুন বা পুরাতন দলগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা এবং সাধারণ মানুষের জন্য আশার আলো। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে জামায়াত আমিরের এই প্রান্তিক মূল্যায়ন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থান কোনো এককালীন ঘটনা নয়, এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। রক্তস্নাত সেই জুলাইয়ের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং এর প্রকৃত সার্থকতা রূপায়নে রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনো বহুদূর পথ পাড়ি দিতে হবে।


Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

৯০ দশকের নস্টালজিয়া বনাম জলবায়ু সংকট: এআই ছবির আড়ালে পুড়ছে পৃথিবী

“স্মৃতির করিডোরে চব্বিশের ক্ষত: এখনো শেষ হয়নি জুলাই”- আমীরে জামায়াত

Update Time : ০৪:৪১:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

মোঃ আলফাজ উদ্দিন, সম্পাদক –দৈনিক প্রান্তিক।


৮ আগস্ট,২০২৬:  রাজনীতির মঞ্চে কখনো কখনো একটি একক বাক্য গোটা জাতির মনস্তত্ত্বকে নাড়িয়ে দেয়। ২০২৬ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান যখন বললেন, “জুলাই এখনো শেষ হয়নি”, তখন তা কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা, রক্তক্ষরণ এবং এখনো অধরা থাকা স্বপ্নের এক জীবন্ত দলিল। ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক এক মর্মস্পর্শী স্থিরচিত্র প্রদর্শনী শেষে তাঁর এই মন্তব্য বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার এক গভীর প্রতিচ্ছবি।

স্মৃতির করিডোরে ইতিহাসের ক্ষত
মিন্টু রোডের প্রদর্শনীটি ফ্যাসিবাদের নির্মমতার বিরুদ্ধে এক পাক্ষিক ও চাক্ষুষ প্রতিবাদ। প্রদর্শনী কক্ষে ঝুলে থাকা প্রতিটি আলোকচিত্র যেন কথা বলছিল। সেখানে ছিল বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হওয়া তরুণের নিথর দেহ, সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে পিতার বোবা কান্না, আর রাজপথে বুক পেতে দেওয়া ছাত্র-জনতার অবিনাশী সাহস। এই আয়োজন দর্শককে মনে করিয়ে দেয়, আজ আমরা যে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তার পেছনে রয়েছে এক মহাসমুদ্র রক্ত। ডা. শফিকুর রহমান ঠিক এই জায়গাটিতেই আঘাত করেছেন—যেই স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের করাল গ্রাসে দেশ বছরের পর বছর পিষ্ট হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি রোধ করাই এই স্মারক প্রদর্শনীর মূল লক্ষ্য।

উপেক্ষিত ইতিহাস রাজনৈতিক সমীকরণ
তবে এই নান্দনিক ও আবেগঘন আয়োজনের সমান্তরালে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক সূক্ষ্ম বিতর্কের রেখাপাত ঘটেছে। প্রদর্শনীতে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের চিত্র ঠাঁই পেলেও, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে পরিচিত জিয়াউর রহমানের কোনো ভূমিকা বা চিত্র স্থান পায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই কৌশলগত অবস্থান দলটির নিজস্ব ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণেরই বহিঃপ্রকাশ। এই অনুপস্থিতি ডানপন্থী রাজনৈতিক বলয়ে এক নীরব অস্বস্তি ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা এই প্রান্তিক প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক।

জুলাইকেন শেষ হয়নি?
জামায়াত আমিরের বক্তব্যের মূল সুর ছিল ‘অধিকার ও আকাঙ্ক্ষা’। চব্বিশের জুলাইয়ের যে গণ-অভ্যুত্থান ছিল রাষ্ট্র সংস্কার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট। ডা. শফিকুর রহমানের দৃষ্টিতে, সেই ম্যান্ডেট বা আকাঙ্ক্ষা এখনো পুরোপুরি অধরা। যতদিন না সাধারণ মানুষের ঘরে চালের জোগান নিশ্চিত হচ্ছে, যতদিন না বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটছে, এবং যতদিন না একটি টেকসই ও বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠছে—ততদিন ক্যালেন্ডারের পাতা যতই উল্টাক না কেন, চেতনার ‘জুলাই’ কখনো শেষ হতে পারে না।


‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’—একটি চলমান লড়াইয়ের ইশতেহার। এটি ক্ষমতার মসনদে বসা নতুন বা পুরাতন দলগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা এবং সাধারণ মানুষের জন্য আশার আলো। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে জামায়াত আমিরের এই প্রান্তিক মূল্যায়ন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থান কোনো এককালীন ঘটনা নয়, এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। রক্তস্নাত সেই জুলাইয়ের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং এর প্রকৃত সার্থকতা রূপায়নে রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনো বহুদূর পথ পাড়ি দিতে হবে।