Dhaka ১০:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাংবাদিকের কণ্ঠ রোধ নয়, নিরাপদ সাংবাদিকতার পরিবেশ চাই

একটি গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজে সাংবাদিকতা নিছক একটি পেশা নয়; এটি জনগণের জানার অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম। রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা ক্ষমতাবান কোনো ব্যক্তি—কেউই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। আর সেই জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য।

দুর্নীতি, অনিয়ম, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনার খবর অনেক সময় প্রশাসনের নথিতে নয়, প্রথমে উঠে আসে সাংবাদিকের প্রতিবেদনে। ফলে সাংবাদিকের নিরাপত্তা কেবল একজন পেশাজীবীর নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি সমাজের তথ্যপ্রবাহ, জনগণের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্ন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার পাশাপাশি আইনের অধীন যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু সাংবিধানিক নিশ্চয়তা এবং বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান থাকলে কাগজে লেখা অধিকার মানুষের জীবনে পূর্ণ অর্থ বহন করে না।

সাংবাদিক কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর স্বাভাবিক প্রতিপক্ষ নন। একজন পেশাদার সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো তথ্য সংগ্রহ করা, তা যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করা।

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশিত হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অপরাধী হয়ে যান না—এ কথা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিরই অংশ। অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করতে হয় এবং অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হয়। একইভাবে সাংবাদিকের প্রকাশিত সংবাদ নিয়েও প্রশ্ন তোলার, প্রতিবাদ করার এবং আইনগত প্রতিকার চাওয়ার অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রয়েছে।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সংবাদে আপত্তির জবাব তথ্য দিয়ে না দিয়ে সাংবাদিককে ভয় দেখানো হয়।

ফোনে হুমকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি, অনুসরণ, শারীরিক হামলা, মামলা দিয়ে চাপ সৃষ্টি, পেশাগতভাবে কোণঠাসা করা কিংবা সরাসরি প্রাণনাশের ভয় দেখানো—এসব কেবল একজন সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ নয়। এগুলো সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের স্বাধীন পরিবেশকে সংকুচিত করে।

সাংবাদিক নিরাপদ না থাকলে সংবাদও নিরাপদ থাকে না।

সাংবাদিকের ওপর সরাসরি হামলার চেয়েও অনেক সময় একটি নীরব ভয় বেশি কার্যকর—self-censorship, অর্থাৎ সাংবাদিকের নিজের কাছেই নিজের সংবাদ থামিয়ে দেওয়া।

বাংলাদেশের সাংবাদিকদের নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, আইনগত বাধা, সরকারি বা রাজনৈতিক চাপ, গণমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো, বিজ্ঞাপননির্ভরতা, সাংবাদিকের রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং ধর্মীয় চাপ—বিভিন্ন কারণে সাংবাদিকরা আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক আচরণে যেতে পারেন। ২০২৫ সালের একটি গবেষণাও বাংলাদেশে সাংবাদিকদের আত্মনিয়ন্ত্রণের ছয়টি প্রধান চাপের উৎস হিসেবে এসব বিষয়কে চিহ্নিত করেছে।

আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে ঘিরে গ্রেপ্তার বা আইনি ব্যবস্থার আশঙ্কা সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করেছে এবং অনেককে এমন কৌশল অবলম্বনে বাধ্য করেছে, যাকে গবেষকেরা ‘defensive journalism’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

অর্থাৎ সাংবাদিকের মুখে তালা লাগানোর জন্য সবসময় সরাসরি নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন হয় না। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করাই যথেষ্ট, যেখানে সাংবাদিক নিজেই ভাবতে শুরু করেন—‘এই সংবাদটি প্রকাশ করলে কী হবে?’

সেখানেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সবচেয়ে গভীর সংকট।

বাংলাদেশে সাংবাদিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি কেবল তাত্ত্বিক নয়; এর বাস্তব উদাহরণও রয়েছে।

২০২৫ সালের আগস্টে গাজীপুরের সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে হামলাকারীদের একটি দলের ওপর হামলার দৃশ্য ধারণ করার পর ধাওয়া করে হত্যা করা হয় বলে CPJ ও ARTICLE 19-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই বছর সাংবাদিক খন্দকার শাহ আলমের মৃত্যুর ঘটনাও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। ARTICLE 19-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, তার ওপর হামলার সঙ্গে তার পূর্ববর্তী সাংবাদিকতার কাজের যোগসূত্র থাকার অভিযোগ ছিল।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ও সাংবাদিকদের ওপর ব্যাপক হামলা, আইনি হয়রানি এবং গণমাধ্যম কার্যালয়ে অভিযানসহ বহু ঘটনার কথা ARTICLE 19 নথিবদ্ধ করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫১টি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত ঘটনায় ১,৪৩০ জন সাংবাদিক প্রভাবিত হন; এর মধ্যে শারীরিক হামলা, আইনি হয়রানি ও সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনাও ছিল।

এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, সাংবাদিক নিরাপত্তা কোনো বিচ্ছিন্ন পেশাগত সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা পরিমাপের আন্তর্জাতিক সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান এখনও উদ্বেগমুক্ত নয়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (RSF) ২০২৬ সালের World Press Freedom Index-এ বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালে অবস্থান ছিল ১৪৯তম। ২০২৬ সালের সূচকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অবস্থান বিশেষভাবে দুর্বল—১৬১তম।

এই অবস্থানকে কেবল একটি র‌্যাংকিং হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। একটি দেশে সাংবাদিক কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন, কতটা নিরাপদে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন এবং সংবাদ প্রকাশের পর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা বা সহিংসতার আশঙ্কা কতটা রয়েছে—এসবই গণমাধ্যমের বাস্তব স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

কোনো সংবাদ ভুল হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অবশ্যই প্রতিবাদ জানাতে পারেন। সংবাদপত্র বা অনলাইন গণমাধ্যমে বক্তব্য পাঠানো, সংশোধনের দাবি করা কিংবা প্রচলিত আইনে উপযুক্ত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু সংবাদে আপত্তির প্রতিক্রিয়া হিসেবে সাংবাদিককে মারধর, হুমকি, অপহরণ, কার্যালয়ে হামলা কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি সংবাদ ভুল হলে তার জবাব হতে পারে সত্য তথ্য।

একটি সংবাদে পক্ষপাত থাকলে তার জবাব হতে পারে তথ্যভিত্তিক প্রতিবাদ।

একটি সংবাদ মানহানিকর হলে তার প্রতিকার হতে পারে আইন।

কিন্তু সংবাদ পছন্দ না হওয়ায় সাংবাদিককে আক্রমণ করা কোনো সভ্য সমাজের ভাষা হতে পারে না।

তবে সাংবাদিকের নিরাপত্তার দাবি কোনোভাবেই সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতাকে খাটো করে না।

স্বাধীন সাংবাদিকতার সঙ্গে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা অবিচ্ছেদ্য। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, একাধিক উৎস থেকে তথ্য নিশ্চিত করা, গুজব ও অনুমানকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন না করা, অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন এড়িয়ে চলা এবং জনস্বার্থের সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ভারসাম্য রক্ষা করা—এসব সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি সাংবাদিকতার পেশাগত মানও রক্ষা করতে হবে।

কারণ স্বাধীনতা দায়িত্বহীনতার লাইসেন্স নয়; বরং স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।

UNESCO সাংবাদিকদের নিরাপত্তাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি (impunity) বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও UNESCO-UNDP-এর ২০২৫ সালের যৌথ মিডিয়া মূল্যায়নে কাঠামোগত সমস্যা, সীমাবদ্ধতামূলক আইন এবং রাজনৈতিক চাপকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আইন ও নীতির সংস্কার, সাংবাদিকদের অধিকতর সুরক্ষা, ন্যায্য পারিশ্রমিক, স্বচ্ছ রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদ নিশ্চিত করার মতো সুপারিশ করা হয়েছে।

সুতরাং সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটার পর কেবল মামলা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত; অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা; এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের জন্য কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা।

কারণ অপরাধের বিচার না হলে অপরাধীর সাহস বাড়ে, আর সাংবাদিকের ভয় বাড়ে।

বর্তমান সময়ে সাংবাদিকের ঝুঁকি কেবল মাঠপর্যায়ের নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি, ট্রল, সংগঠিত অপপ্রচার, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ভয়, অনলাইন হয়রানি এবং নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি—সবকিছুই সাংবাদিকতার নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠেছে।

জাতিসংঘও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি, বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের ওপর ডিজিটাল আক্রমণ, বাস্তব জীবনে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছে।

অতএব সাংবাদিক নিরাপত্তার নীতি তৈরি করতে হলে মাঠের নিরাপত্তার পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সাংবাদিকতা মূলত জনগণের জন্য।

একটি প্রত্যন্ত গ্রামের রাস্তা ভেঙে গেলে, কোনো সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি হলে, কোথাও চাঁদাবাজি চললে, কোনো শ্রমিক তার ন্যায্য মজুরি না পেলে কিংবা কোনো নাগরিক অন্যায়ের শিকার হলে—সেই খবর প্রকাশের মাধ্যমে সাংবাদিক কেবল সংবাদ তৈরি করেন না; তিনি সমাজকে তথ্য দেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির মুখোমুখি করেন।

এই কারণে সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার রক্ষা করা।

একজন সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে হয়তো একটি প্রতিবেদন থামানো যায়। কিন্তু তার সঙ্গে থেমে যেতে পারে একটি এলাকার মানুষের কণ্ঠ, একটি দুর্নীতির তথ্য, একটি নিপীড়নের ঘটনা কিংবা একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আতঙ্কিত হবেন না; সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হবেন না।

আমরা এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যেখানে সাংবাদিককে রাজনৈতিক আনুগত্য, মালিকের স্বার্থ, বিজ্ঞাপনদাতার চাপ কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তির ভয়—কোনোটির কাছেই পেশাগত বিবেক বিসর্জন দিতে হবে না।

একই সঙ্গে আমরা এমন সাংবাদিকতাও চাই, যেখানে সংবাদ হবে যাচাইকৃত, ভাষা হবে সংযত, অভিযোগ হবে প্রমাণনির্ভর এবং জনস্বার্থ থাকবে পেশাগত সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে।

কারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি গণমাধ্যমের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

এই দুইয়ের ভারসাম্যই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি।

সাংবাদিককে শত্রু হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সংবাদে আপত্তি থাকলে সংবাদ দিয়ে জবাব দিতে হবে; তথ্য দিয়ে ভুল সংশোধন করতে হবে; প্রয়োজন হলে আইনের আশ্রয় নিতে হবে।

হামলা, হুমকি, ভয়ভীতি কিংবা প্রতিহিংসা কোনো সংবাদকে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে না। বরং এসব কর্মকাণ্ড কেবল সমাজে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে এবং সাংবাদিকদের আত্মনিয়ন্ত্রণে ঠেলে দেয়।

একটি গবেষণায় বাংলাদেশি সাংবাদিকদের আত্মনিয়ন্ত্রণের ওপর বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক চাপের যে চিত্র উঠে এসেছে, আর সাম্প্রতিক গবেষণায় গণমাধ্যমে সরকার, মালিকানা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-নির্ভর ‘media capture’-এর যে প্রভাব চিহ্নিত হয়েছে—তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাংবাদিকের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই শুধু সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে নয়; এটি ভয়, চাপ ও প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই।

তাই এখন প্রয়োজন—

সাংবাদিকের কণ্ঠ রোধ নয়, নিরাপদ সাংবাদিকতার পরিবেশ।

প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামো, যেখানে সাংবাদিকের ওপর হামলার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, অপরাধীর পরিচয় নয়—অপরাধই হবে বিচারের মাপকাঠি, এবং সাংবাদিক তার পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে কার্যকর সুরক্ষা পাবেন।

কারণ—

সাংবাদিককে নীরব করা মানে শুধু একজন মানুষকে থামিয়ে দেওয়া নয়; এর সঙ্গে থেমে যেতে পারে সমাজের বহু অজানা সত্য। আর সেই নীরবতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জনগণের—যাদের জানার অধিকারই একটি গণতন্ত্রের প্রাণ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

৯০ দশকের নস্টালজিয়া বনাম জলবায়ু সংকট: এআই ছবির আড়ালে পুড়ছে পৃথিবী

সাংবাদিকের কণ্ঠ রোধ নয়, নিরাপদ সাংবাদিকতার পরিবেশ চাই

Update Time : ০৭:০৭:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

একটি গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজে সাংবাদিকতা নিছক একটি পেশা নয়; এটি জনগণের জানার অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম। রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা ক্ষমতাবান কোনো ব্যক্তি—কেউই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। আর সেই জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য।

দুর্নীতি, অনিয়ম, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনার খবর অনেক সময় প্রশাসনের নথিতে নয়, প্রথমে উঠে আসে সাংবাদিকের প্রতিবেদনে। ফলে সাংবাদিকের নিরাপত্তা কেবল একজন পেশাজীবীর নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি সমাজের তথ্যপ্রবাহ, জনগণের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্ন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার পাশাপাশি আইনের অধীন যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু সাংবিধানিক নিশ্চয়তা এবং বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান থাকলে কাগজে লেখা অধিকার মানুষের জীবনে পূর্ণ অর্থ বহন করে না।

সাংবাদিক কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর স্বাভাবিক প্রতিপক্ষ নন। একজন পেশাদার সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো তথ্য সংগ্রহ করা, তা যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করা।

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশিত হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অপরাধী হয়ে যান না—এ কথা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিরই অংশ। অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করতে হয় এবং অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হয়। একইভাবে সাংবাদিকের প্রকাশিত সংবাদ নিয়েও প্রশ্ন তোলার, প্রতিবাদ করার এবং আইনগত প্রতিকার চাওয়ার অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রয়েছে।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সংবাদে আপত্তির জবাব তথ্য দিয়ে না দিয়ে সাংবাদিককে ভয় দেখানো হয়।

ফোনে হুমকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি, অনুসরণ, শারীরিক হামলা, মামলা দিয়ে চাপ সৃষ্টি, পেশাগতভাবে কোণঠাসা করা কিংবা সরাসরি প্রাণনাশের ভয় দেখানো—এসব কেবল একজন সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ নয়। এগুলো সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের স্বাধীন পরিবেশকে সংকুচিত করে।

সাংবাদিক নিরাপদ না থাকলে সংবাদও নিরাপদ থাকে না।

সাংবাদিকের ওপর সরাসরি হামলার চেয়েও অনেক সময় একটি নীরব ভয় বেশি কার্যকর—self-censorship, অর্থাৎ সাংবাদিকের নিজের কাছেই নিজের সংবাদ থামিয়ে দেওয়া।

বাংলাদেশের সাংবাদিকদের নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, আইনগত বাধা, সরকারি বা রাজনৈতিক চাপ, গণমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো, বিজ্ঞাপননির্ভরতা, সাংবাদিকের রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং ধর্মীয় চাপ—বিভিন্ন কারণে সাংবাদিকরা আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক আচরণে যেতে পারেন। ২০২৫ সালের একটি গবেষণাও বাংলাদেশে সাংবাদিকদের আত্মনিয়ন্ত্রণের ছয়টি প্রধান চাপের উৎস হিসেবে এসব বিষয়কে চিহ্নিত করেছে।

আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে ঘিরে গ্রেপ্তার বা আইনি ব্যবস্থার আশঙ্কা সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করেছে এবং অনেককে এমন কৌশল অবলম্বনে বাধ্য করেছে, যাকে গবেষকেরা ‘defensive journalism’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

অর্থাৎ সাংবাদিকের মুখে তালা লাগানোর জন্য সবসময় সরাসরি নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন হয় না। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করাই যথেষ্ট, যেখানে সাংবাদিক নিজেই ভাবতে শুরু করেন—‘এই সংবাদটি প্রকাশ করলে কী হবে?’

সেখানেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সবচেয়ে গভীর সংকট।

বাংলাদেশে সাংবাদিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি কেবল তাত্ত্বিক নয়; এর বাস্তব উদাহরণও রয়েছে।

২০২৫ সালের আগস্টে গাজীপুরের সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে হামলাকারীদের একটি দলের ওপর হামলার দৃশ্য ধারণ করার পর ধাওয়া করে হত্যা করা হয় বলে CPJ ও ARTICLE 19-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই বছর সাংবাদিক খন্দকার শাহ আলমের মৃত্যুর ঘটনাও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। ARTICLE 19-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, তার ওপর হামলার সঙ্গে তার পূর্ববর্তী সাংবাদিকতার কাজের যোগসূত্র থাকার অভিযোগ ছিল।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ও সাংবাদিকদের ওপর ব্যাপক হামলা, আইনি হয়রানি এবং গণমাধ্যম কার্যালয়ে অভিযানসহ বহু ঘটনার কথা ARTICLE 19 নথিবদ্ধ করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫১টি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত ঘটনায় ১,৪৩০ জন সাংবাদিক প্রভাবিত হন; এর মধ্যে শারীরিক হামলা, আইনি হয়রানি ও সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনাও ছিল।

এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, সাংবাদিক নিরাপত্তা কোনো বিচ্ছিন্ন পেশাগত সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা পরিমাপের আন্তর্জাতিক সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান এখনও উদ্বেগমুক্ত নয়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (RSF) ২০২৬ সালের World Press Freedom Index-এ বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালে অবস্থান ছিল ১৪৯তম। ২০২৬ সালের সূচকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অবস্থান বিশেষভাবে দুর্বল—১৬১তম।

এই অবস্থানকে কেবল একটি র‌্যাংকিং হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। একটি দেশে সাংবাদিক কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন, কতটা নিরাপদে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন এবং সংবাদ প্রকাশের পর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা বা সহিংসতার আশঙ্কা কতটা রয়েছে—এসবই গণমাধ্যমের বাস্তব স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

কোনো সংবাদ ভুল হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অবশ্যই প্রতিবাদ জানাতে পারেন। সংবাদপত্র বা অনলাইন গণমাধ্যমে বক্তব্য পাঠানো, সংশোধনের দাবি করা কিংবা প্রচলিত আইনে উপযুক্ত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু সংবাদে আপত্তির প্রতিক্রিয়া হিসেবে সাংবাদিককে মারধর, হুমকি, অপহরণ, কার্যালয়ে হামলা কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি সংবাদ ভুল হলে তার জবাব হতে পারে সত্য তথ্য।

একটি সংবাদে পক্ষপাত থাকলে তার জবাব হতে পারে তথ্যভিত্তিক প্রতিবাদ।

একটি সংবাদ মানহানিকর হলে তার প্রতিকার হতে পারে আইন।

কিন্তু সংবাদ পছন্দ না হওয়ায় সাংবাদিককে আক্রমণ করা কোনো সভ্য সমাজের ভাষা হতে পারে না।

তবে সাংবাদিকের নিরাপত্তার দাবি কোনোভাবেই সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতাকে খাটো করে না।

স্বাধীন সাংবাদিকতার সঙ্গে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা অবিচ্ছেদ্য। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, একাধিক উৎস থেকে তথ্য নিশ্চিত করা, গুজব ও অনুমানকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন না করা, অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন এড়িয়ে চলা এবং জনস্বার্থের সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ভারসাম্য রক্ষা করা—এসব সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি সাংবাদিকতার পেশাগত মানও রক্ষা করতে হবে।

কারণ স্বাধীনতা দায়িত্বহীনতার লাইসেন্স নয়; বরং স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।

UNESCO সাংবাদিকদের নিরাপত্তাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি (impunity) বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও UNESCO-UNDP-এর ২০২৫ সালের যৌথ মিডিয়া মূল্যায়নে কাঠামোগত সমস্যা, সীমাবদ্ধতামূলক আইন এবং রাজনৈতিক চাপকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আইন ও নীতির সংস্কার, সাংবাদিকদের অধিকতর সুরক্ষা, ন্যায্য পারিশ্রমিক, স্বচ্ছ রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদ নিশ্চিত করার মতো সুপারিশ করা হয়েছে।

সুতরাং সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটার পর কেবল মামলা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত; অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা; এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের জন্য কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা।

কারণ অপরাধের বিচার না হলে অপরাধীর সাহস বাড়ে, আর সাংবাদিকের ভয় বাড়ে।

বর্তমান সময়ে সাংবাদিকের ঝুঁকি কেবল মাঠপর্যায়ের নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি, ট্রল, সংগঠিত অপপ্রচার, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ভয়, অনলাইন হয়রানি এবং নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি—সবকিছুই সাংবাদিকতার নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠেছে।

জাতিসংঘও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি, বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের ওপর ডিজিটাল আক্রমণ, বাস্তব জীবনে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছে।

অতএব সাংবাদিক নিরাপত্তার নীতি তৈরি করতে হলে মাঠের নিরাপত্তার পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সাংবাদিকতা মূলত জনগণের জন্য।

একটি প্রত্যন্ত গ্রামের রাস্তা ভেঙে গেলে, কোনো সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি হলে, কোথাও চাঁদাবাজি চললে, কোনো শ্রমিক তার ন্যায্য মজুরি না পেলে কিংবা কোনো নাগরিক অন্যায়ের শিকার হলে—সেই খবর প্রকাশের মাধ্যমে সাংবাদিক কেবল সংবাদ তৈরি করেন না; তিনি সমাজকে তথ্য দেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির মুখোমুখি করেন।

এই কারণে সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার রক্ষা করা।

একজন সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে হয়তো একটি প্রতিবেদন থামানো যায়। কিন্তু তার সঙ্গে থেমে যেতে পারে একটি এলাকার মানুষের কণ্ঠ, একটি দুর্নীতির তথ্য, একটি নিপীড়নের ঘটনা কিংবা একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আতঙ্কিত হবেন না; সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হবেন না।

আমরা এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যেখানে সাংবাদিককে রাজনৈতিক আনুগত্য, মালিকের স্বার্থ, বিজ্ঞাপনদাতার চাপ কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তির ভয়—কোনোটির কাছেই পেশাগত বিবেক বিসর্জন দিতে হবে না।

একই সঙ্গে আমরা এমন সাংবাদিকতাও চাই, যেখানে সংবাদ হবে যাচাইকৃত, ভাষা হবে সংযত, অভিযোগ হবে প্রমাণনির্ভর এবং জনস্বার্থ থাকবে পেশাগত সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে।

কারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি গণমাধ্যমের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

এই দুইয়ের ভারসাম্যই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি।

সাংবাদিককে শত্রু হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সংবাদে আপত্তি থাকলে সংবাদ দিয়ে জবাব দিতে হবে; তথ্য দিয়ে ভুল সংশোধন করতে হবে; প্রয়োজন হলে আইনের আশ্রয় নিতে হবে।

হামলা, হুমকি, ভয়ভীতি কিংবা প্রতিহিংসা কোনো সংবাদকে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে না। বরং এসব কর্মকাণ্ড কেবল সমাজে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে এবং সাংবাদিকদের আত্মনিয়ন্ত্রণে ঠেলে দেয়।

একটি গবেষণায় বাংলাদেশি সাংবাদিকদের আত্মনিয়ন্ত্রণের ওপর বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক চাপের যে চিত্র উঠে এসেছে, আর সাম্প্রতিক গবেষণায় গণমাধ্যমে সরকার, মালিকানা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-নির্ভর ‘media capture’-এর যে প্রভাব চিহ্নিত হয়েছে—তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাংবাদিকের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই শুধু সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে নয়; এটি ভয়, চাপ ও প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই।

তাই এখন প্রয়োজন—

সাংবাদিকের কণ্ঠ রোধ নয়, নিরাপদ সাংবাদিকতার পরিবেশ।

প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামো, যেখানে সাংবাদিকের ওপর হামলার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, অপরাধীর পরিচয় নয়—অপরাধই হবে বিচারের মাপকাঠি, এবং সাংবাদিক তার পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে কার্যকর সুরক্ষা পাবেন।

কারণ—

সাংবাদিককে নীরব করা মানে শুধু একজন মানুষকে থামিয়ে দেওয়া নয়; এর সঙ্গে থেমে যেতে পারে সমাজের বহু অজানা সত্য। আর সেই নীরবতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জনগণের—যাদের জানার অধিকারই একটি গণতন্ত্রের প্রাণ।