জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি
কবি চলে গেছেন পঞ্চাশ বছর আগে। কিন্তু তাঁর বাঁশি থামেনি। সময়ের দীর্ঘ করিডোর পেরিয়ে আজও কোথাও যেন সেই বাঁশির সুর ভেসে আসে। কখনো সে সুর বিদ্রোহের, কখনো প্রেমের। কখনো সাম্যের, কখনো মানবমুক্তির। কখনো আবার নিপীড়িত মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা অশ্রুর ভাষা হয়ে ওঠে।
কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এমন এক কবি, যাঁকে কেবল একটি সময়ের কবি বলে আটকে রাখা যায় না। তিনি ছিলেন সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক অস্থির আত্মা। তাঁর কবিতায় যেমন ছিল বজ্রের গর্জন, তেমনি ছিল বাঁশির কোমল সুর। এক হাতে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মশাল ধরেছেন, অন্য হাতে মানুষের হৃদয়ে জ্বেলে দিয়েছেন ভালোবাসার প্রদীপ।
আজ তাঁর মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর।
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিদ্রোহী কবি। তাঁর শেষযাত্রায় একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছিল। কিন্তু নজরুলের কবিতার কোনো সমাপ্তি হয়নি। কারণ তাঁর কবিতা কেবল কাগজে লেখা কিছু শব্দ নয়। তা মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে মিশে থাকা এক অনিঃশেষ উচ্চারণ।
নজরুল যখন লিখেছিলেন—
“আমি চির-বিদ্রোহী বীর—
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!”
তখন তিনি কেবল নিজের কথা বলেননি। তিনি যেন সেইসব মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন, যাদের মাথা নত করিয়ে রাখতে চেয়েছিল সাম্রাজ্য, শোষণ আর সামাজিক বৈষম্য।
তাঁর বিদ্রোহ ছিল মানুষের বিরুদ্ধে নয়; মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্যের বিরুদ্ধে। তাঁর আঘাত ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তাঁর যুদ্ধ ছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে। আর তাঁর স্বপ্ন ছিল এমন এক পৃথিবীর, যেখানে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার আগে তার ধর্ম, বর্ণ, জাত কিংবা পরিচয়ের হিসাব করা হবে না।
এই কারণেই নজরুল একই সঙ্গে মসজিদের আজান, মন্দিরের ঘণ্টা এবং মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন শুনতে পেয়েছেন। তাঁর গানে ইসলামী ভাবধারা যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে শ্যামাসংগীত, বৈষ্ণব পদাবলির আবহ এবং মানবপ্রেমের সর্বজনীন বাণী। তিনি বিভেদের দেয়ালে দাঁড়িয়ে বিভেদের ভাষা শেখেননি। বরং দেয়াল ভেঙে মানুষের কাছে পৌঁছানোর পথ খুঁজেছেন।
নজরুলের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত এখানেই—তিনি মানুষকে ভালোবেসেছেন।
তাঁর প্রেমও তাই নিছক ব্যক্তিগত আবেগে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রেম তাঁর কাছে কখনো হয়েছে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, কখনো সৌন্দর্যের আরাধনা, কখনো নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস।
আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে নজরুলকে পড়লে বিস্মিত হতে হয়। প্রযুক্তি বদলেছে, রাষ্ট্রের কাঠামো বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। কিন্তু অন্যায়, বৈষম্য, অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতার দম্ভ কিংবা মানুষের ওপর মানুষের শোষণ—এসব কি সত্যিই বিলীন হয়েছে?
হয়নি।
তাই নজরুলও পুরোনো হয়ে যাননি।
যে সমাজে মানুষ তার পরিচয়ের কারণে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যায়, সেখানে নজরুলের সাম্যের বাণী প্রয়োজন। যে রাজনীতিতে ক্ষমতা মানুষের ওপরে উঠে দাঁড়ায়, সেখানে নজরুলের বিদ্রোহ প্রয়োজন। যে সময়ে ধর্মের নামে বিভাজন তৈরি হয়, সেখানে নজরুলের মানবতার গান প্রয়োজন। যে অর্থনীতিতে একদল মানুষের প্রাচুর্যের পাশে আরেকদল মানুষের অনাহার দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে নজরুলের শোষণবিরোধী কণ্ঠ প্রয়োজন।
নজরুলকে তাই শুধু ফুল দিয়ে স্মরণ করলে তাঁর প্রতি সুবিচার হয় না।
তাঁকে স্মরণ করতে হলে তাঁর প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে হয়।
তিনি জানতে চেয়েছিলেন—মানুষের পৃথিবীতে মানুষ কেন এত অসহায়? কেন শক্তিমান দুর্বলকে পদদলিত করবে? কেন মানুষের পরিচয় তার মানবিকতার চেয়ে বড় হয়ে উঠবে?
এই প্রশ্নগুলো আজও আমাদের তাড়া করে।
নজরুলের জীবনও ছিল এক বিস্ময়কর যাত্রা। সৈনিকজীবন থেকে সাহিত্য, সাংবাদিকতা থেকে রাজনীতি, কবিতা থেকে গান—জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর কলম ছিল যেমন ধারালো, তাঁর সুর তেমনি মমতাময়।
তিনি একই সঙ্গে বিদ্রোহী ও প্রেমিক।
একদিকে তিনি লিখেছেন আগুনের মতো কবিতা, অন্যদিকে সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য প্রেমের গান। একদিকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ উচ্চকিত হয়েছে, অন্যদিকে শ্যামার কাছে তিনি নিবেদন করেছেন ভক্তির গান। এই বৈপরীত্যই তাঁকে আরও বড় করে তুলেছে। কারণ মানুষ নিজেই তো বৈপরীত্যের সমষ্টি।
নজরুল সেই মানুষকেই আবিষ্কার করেছিলেন।
জীবনের শেষ দীর্ঘ সময় তিনি ছিলেন বাকরুদ্ধ। যে মানুষটি একদিন শব্দ দিয়ে সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, শেষ জীবনে সেই শব্দই যেন তাঁর কাছে অধরা হয়ে গেল। অথচ তাঁর নীরবতাও এক অর্থে কথা বলে গেছে।
একজন কবির কণ্ঠ থেমে যেতে পারে।
কিন্তু কবিতার কণ্ঠ থামে না।
পঞ্চাশ বছর পরও তাই নজরুল আমাদের কাছে ফিরে আসেন। ফিরে আসেন কোনো স্মরণসভায় আবৃত্ত হওয়া কয়েকটি পঙ্ক্তিতে। ফিরে আসেন কোনো শিল্পীর কণ্ঠে গাওয়া গানে। ফিরে আসেন কোনো তরুণের প্রতিবাদী মিছিলে। ফিরে আসেন কোনো নিঃস্ব মানুষের চোখের জলে। ফিরে আসেন প্রেমিকের ভালোবাসায়।
আর ফিরে আসেন যখন কোনো মানুষ অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলে—না, আমি মাথা নত করব না।
নজরুলের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তাঁর বিদ্রোহের মৃত্যু হয়নি।
তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ হয়েছে। কিন্তু তাঁর গান থামেনি।
তাঁর শরীর মাটিতে শুয়ে আছে। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন এখনো মানুষের ভিতরে হাঁটে।
আজ তাঁর মৃত্যুর পঞ্চাশতম বছরে তাই শোকের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে প্রত্যয়ের প্রশ্ন। আমরা কি নজরুলকে কেবল জাতীয় কবি হিসেবে স্মরণ করব, নাকি তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার দায়ও নিজেদের কাঁধে নেব?
উত্তরটি আমাদেরই দিতে হবে।
কারণ কবিরা চলে যান।
কবিতারা থেকে যায়।
সময় চলে যায়।
সুর থেকে যায়।
মানুষ চলে যায়।
মানবতার স্বপ্ন থেকে যায়।
আর কোথাও—খুব দূরে নয়, আমাদেরই অন্তরের কোনো গোপন উঠোনে—আজও অনন্ত সুরে বাঁশি বাজে।
সে বাঁশির নাম নজরুল।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন,সম্পাদক -দৈনিক প্রান্তিক। 

















