মোঃ আলফাজ উদ্দিন,সম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক।
সারা দেশে হঠাৎ করিয়াই বোমা ও বিস্ফোরকের এক মহোৎসব শুরু হইয়াছে। রাজধানী ঢাকার রাজপথ হইতে শুরু করিয়া সাভার-আশুলিয়ার নিভৃত কোণ পর্যন্ত আজ বারুদের গন্ধে ভারী। সংবাদ আসিতেছে, কোথাও প্রেসার কুকার বোমা, কোথাও পাইপবোমা, আবার কোথাও বা চরম ক্ষমতাসম্পন্ন আইইডির সন্ধান মিলিতেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উথাল-পাথাল করিয়া খুঁজিতেছে এই মারণাস্ত্রের উৎস। তাহাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ, চোখে গভীর উদ্বেগ। কিন্তু রাষ্ট্র কি কেবলই বুলেটের জোরে এই ব্যাধির চিকিৎসা করিতে পারিবে, নাকি ব্যাধিটি আরও গভীর কোনো মজ্জায় চড়িয়া বসিয়াছে, তাহাই আজ বড় প্রশ্ন হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
এই ভূখণ্ডে উগ্রবাদের চাষবাস নতুন কিছু নয়। তবে এবারের উপদ্রবটি আসিয়াছে এক চরম শূন্যতার সময়ে। যখনই সমাজে বুদ্ধি ও সংস্কৃতির স্বৈরাচার কিংবা রাজনীতির নামে একপ্রকার দেউলিয়াত্ব তৈরি হয়, তখনই এই জাতীয় অন্ধ শক্তির উত্থান ঘটে। আমাদের দেশের একদল যুবক কেন আজ নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করিয়া, সমাজকে ধ্বংস করিবার জন্য কারখানায় বোমা বানাইতেছে? ইহারা কি কেবলই বিপথগামী, নাকি কোনো এক অদৃশ্য ইশারায় চালিত পুতুল? দেশকে জঙ্গী রাষ্ট্রের তকমা দেওয়ার পুরাতন ষঢ়যন্ত্র আবারও মাথাচাড়াও দিয়া উঠিবার এই হীন চেষ্টার পেছনে পতিত স্বৈরাচারী শক্তি ও দেশবিরোধী বিদেশী শক্তি কী এক হইয়া গেল; সেই প্রশ্নও দেখা দিয়াছে।
মেট্রোরেলের আধুনিক স্তম্ভের নিচে যখন টাইমবোমা সদৃশ বস্তু পাওয়া যায়, তখন বুঝা যায় এই মারণকামড় কতখানি সুদূরপ্রসারী। ইহা কেবল জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি নয়, ইহাকে বলিতে হইবে একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডকে কাঁপাইয়া দেওয়ার অপচেষ্টা। পুলিশ সদর দপ্তর হইতে সারা দেশে ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ জারি করা হইয়াছে। রাত-দিন চেকপোস্ট বসিতেছে, তল্লাশি চলিতেছে। কিন্তু আহমদ ছফা যদি আজ বাঁচিয়া থাকিতেন, তবে নির্ঘাত বলিতেন— রাষ্ট্র কেবল লাঠি উঁচাইয়া নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে পারে না। যে সমাজে তরুণেরা স্বপ্ন দেখে না, যে সমাজে মেধার মূল্যায়ন নাই, সেখানে তরুণেরা বোমার কারিগর হইবে, ইহাই তো স্বাভাবিক নিয়তি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই উদ্বেগ অত্যন্ত যৌক্তিক ও বাস্তব। কিন্তু কেবল ‘দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড’ বলিয়া দায় এড়াইলে চলিবে না। এই অন্ধ শক্তির পেছনে যে কুৎসিত রাজনৈতিক ও অর্থায়নের খেলা রহিয়াছে, তাহার মূল উপড়াইয়া ফেলা আবশ্যক। যদি আমরা এখনই আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক জমিনকে উর্বর না করিতে পারি, তবে এই বোমার আগুন একদিন গোটা সমাজকে গ্রাস করিবে। রাষ্ট্র যেন কেবল পাহারা দেওয়ার কাজেই ব্যস্ত না থাকে, তাহাকে তাহার ভেতরের ক্ষয়ে যাওয়া আত্মাকেও মেরামত করিতে হইবে।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন,সম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক। 














