Dhaka ০৩:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২৫ বছর কারাভোগের পর মুক্তি, দেড় মাসের মাথায় গুলিবিদ্ধ ‘কাইল্লা পলাশ’

রামপুরার ব্যস্ত দুপুরে রক্তাক্ত হামলা; পুরোনো বিরোধ, প্রতিশোধ নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের নতুন সমীকরণ?

বিশেষ প্রতিবেদক-প্রান্তিক।

মাত্র দেড় মাস আগে কারাগারের ফটক পেরিয়ে মুক্ত বাতাসে ফিরেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ২৫ বছর কারাভোগের পর নতুন জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে সমাজে ফেরার সুযোগ পেয়েছিলেন এক সময়ের আলোচিত আন্ডারওয়ার্ল্ড ব্যক্তিত্ব ইয়াসিন খান পলাশ, যিনি ‘কাইল্লা পলাশ’ নামেই বেশি পরিচিত। কিন্তু মুক্তির আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। রাজধানীর রামপুরায় প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র হামলার শিকার হয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন তিনি।

শুক্রবার (১২ জুন ২০২৬) দুপুরে ঢাকার রামপুরা এলাকায় জুমার নামাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন পলাশ। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রামপুরা বাজারসংলগ্ন রয়েল মিষ্টান্ন ভান্ডারের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন দুর্বৃত্ত তার গতিরোধ করে। মুহূর্তের মধ্যেই কাছ থেকে গুলি ছোড়া হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন পলাশ। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নিকটস্থ হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। চিকিৎসকরা তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন।

ঘটনার পরপরই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দিনের আলোয় রাজধানীর একটি ব্যস্ত এলাকায় এ ধরনের হামলা স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং হামলাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তবে হামলার পেছনের উদ্দেশ্য এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, হামলার পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত শত্রুতা, পুরোনো অপরাধজগতের বিরোধ, প্রতিশোধমূলক হামলা কিংবা আন্ডারওয়ার্ল্ডে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো দ্বন্দ্ব। দীর্ঘ কারাবাসের কারণে পলাশ সক্রিয় অপরাধ জগতের বাইরে থাকলেও তার অতীত পরিচয় এবং পুরোনো শত্রুতার বিষয়গুলো তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

পলাশের অতীতও কম আলোচিত নয়। ২০০০-এর দশকের শুরুতে রাজধানীর অপরাধ জগতের পরিচিত মুখ ছিলেন তিনি। যুবদল নেতা মিজানুর রহমান মিজান হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর প্রথমে মৃত্যুদণ্ড এবং পরে উচ্চ আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর কারাভোগের পর সম্প্রতি তিনি মুক্তি লাভ করেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কারামুক্তির পর পলাশের চলাফেরা, যোগাযোগ এবং কার সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হামলাটি পরিকল্পিত কি না, কিংবা এর সঙ্গে পুরোনো কোনো অপরাধচক্রের সম্পর্ক আছে কি না—সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

রামপুরার এই গুলিবর্ষণের ঘটনা শুধু একজন সাবেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর ওপর হামলা নয়; এটি রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং অপরাধজগতের অন্তর্গত অদৃশ্য দ্বন্দ্ব নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ২৫ বছর কারাগারে কাটানোর পর যে মানুষটি নতুন জীবনের পথে হাঁটতে শুরু করেছিলেন, তাকে ঘিরে আবারও রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা হলো। এখন সবার চোখ তদন্তের দিকে—এই হামলার নেপথ্যে কি পুরোনো হিসাব-নিকাশ, নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের নতুন কোনো শক্তির উত্থান?

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

২৫ বছর কারাভোগের পর মুক্তি, দেড় মাসের মাথায় গুলিবিদ্ধ ‘কাইল্লা পলাশ’

২৫ বছর কারাভোগের পর মুক্তি, দেড় মাসের মাথায় গুলিবিদ্ধ ‘কাইল্লা পলাশ’

Update Time : ০৬:০৫:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

রামপুরার ব্যস্ত দুপুরে রক্তাক্ত হামলা; পুরোনো বিরোধ, প্রতিশোধ নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের নতুন সমীকরণ?

বিশেষ প্রতিবেদক-প্রান্তিক।

মাত্র দেড় মাস আগে কারাগারের ফটক পেরিয়ে মুক্ত বাতাসে ফিরেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ২৫ বছর কারাভোগের পর নতুন জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে সমাজে ফেরার সুযোগ পেয়েছিলেন এক সময়ের আলোচিত আন্ডারওয়ার্ল্ড ব্যক্তিত্ব ইয়াসিন খান পলাশ, যিনি ‘কাইল্লা পলাশ’ নামেই বেশি পরিচিত। কিন্তু মুক্তির আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। রাজধানীর রামপুরায় প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র হামলার শিকার হয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন তিনি।

শুক্রবার (১২ জুন ২০২৬) দুপুরে ঢাকার রামপুরা এলাকায় জুমার নামাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন পলাশ। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রামপুরা বাজারসংলগ্ন রয়েল মিষ্টান্ন ভান্ডারের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন দুর্বৃত্ত তার গতিরোধ করে। মুহূর্তের মধ্যেই কাছ থেকে গুলি ছোড়া হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন পলাশ। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নিকটস্থ হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। চিকিৎসকরা তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন।

ঘটনার পরপরই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দিনের আলোয় রাজধানীর একটি ব্যস্ত এলাকায় এ ধরনের হামলা স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং হামলাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তবে হামলার পেছনের উদ্দেশ্য এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, হামলার পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত শত্রুতা, পুরোনো অপরাধজগতের বিরোধ, প্রতিশোধমূলক হামলা কিংবা আন্ডারওয়ার্ল্ডে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো দ্বন্দ্ব। দীর্ঘ কারাবাসের কারণে পলাশ সক্রিয় অপরাধ জগতের বাইরে থাকলেও তার অতীত পরিচয় এবং পুরোনো শত্রুতার বিষয়গুলো তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

পলাশের অতীতও কম আলোচিত নয়। ২০০০-এর দশকের শুরুতে রাজধানীর অপরাধ জগতের পরিচিত মুখ ছিলেন তিনি। যুবদল নেতা মিজানুর রহমান মিজান হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর প্রথমে মৃত্যুদণ্ড এবং পরে উচ্চ আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর কারাভোগের পর সম্প্রতি তিনি মুক্তি লাভ করেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কারামুক্তির পর পলাশের চলাফেরা, যোগাযোগ এবং কার সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হামলাটি পরিকল্পিত কি না, কিংবা এর সঙ্গে পুরোনো কোনো অপরাধচক্রের সম্পর্ক আছে কি না—সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

রামপুরার এই গুলিবর্ষণের ঘটনা শুধু একজন সাবেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর ওপর হামলা নয়; এটি রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং অপরাধজগতের অন্তর্গত অদৃশ্য দ্বন্দ্ব নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ২৫ বছর কারাগারে কাটানোর পর যে মানুষটি নতুন জীবনের পথে হাঁটতে শুরু করেছিলেন, তাকে ঘিরে আবারও রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা হলো। এখন সবার চোখ তদন্তের দিকে—এই হামলার নেপথ্যে কি পুরোনো হিসাব-নিকাশ, নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের নতুন কোনো শক্তির উত্থান?