Dhaka ০৪:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তালাক ছাড়াই বিয়ে মামলা

নাসির-তামিমার ভাগ্য নির্ধারণ ১০ জুন, নজরে দেশজুড়ে আলোচিত সেই মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক-প্রান্তিক।

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক তারকা ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা সুলতানার বিরুদ্ধে করা বহুল আলোচিত ‘তালাক ছাড়াই বিয়ে’ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে ১০ জুন। ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত এ রায় দেবেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, সামাজিক বিতর্ক এবং গণমাধ্যমের ব্যাপক আলোচনার পর মামলাটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইসরাত হাসান জানিয়েছেন, মামলায় আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করেন এবং আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করছেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং নাসির ও তামিমাকে খালাস দেওয়া উচিত।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ব্যবসায়ী রাকিব হাসানের সঙ্গে তামিমা সুলতানার বিয়ে হয়। তাদের সংসারে একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, রাকিবের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় ২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাসির হোসেনকে বিয়ে করেন।

পরবর্তীতে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাসির ও তামিমার বিয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। রাকিব হাসান দাবি করেন, তাকে তালাক না দিয়েই তামিমা দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলা দায়ের করেন।

তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক শেখ মিজানুর রহমান ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে নাসির হোসেন, তামিমা সুলতানা এবং তামিমার মাকে অভিযুক্ত করা হয়। পরে ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আদালত নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন।

মামলাটি শুরু থেকেই ব্যাপক আলোচিত ছিল। কারণ, একদিকে জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার হিসেবে নাসির হোসেন দীর্ঘদিন জনপ্রিয় মুখ ছিলেন, অন্যদিকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারিবারিক বিরোধ এবং আইনি প্রশ্ন একসঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ায় ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়।

বিচার চলাকালে আদালত মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ২০২৩ সালের ২০ মার্চ বাদী রাকিব হাসানের সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয় এবং চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। গত ১০ মার্চ আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে নাসির ও তামিমা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।

গত ৬ মে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের জন্য ১০ জুন দিন ধার্য করেন। শুনানির সময় নাসির ও তামিমা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

আইনজীবীরা জানিয়েছেন, মামলায় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে নাসির হোসেন সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। অন্যদিকে তামিমা সুলতানার বিরুদ্ধে আনা একাধিক ধারায় সর্বোচ্চ ২১ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ মামলার রায় শুধু একটি পারিবারিক বিরোধের নিষ্পত্তিই নয়, বরং মুসলিম পারিবারিক আইন, বিবাহ নিবন্ধন এবং দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে তালাক কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া, নথিপত্রের বৈধতা এবং বিবাহের আইনি অবস্থান নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ক্রিকেট অঙ্গনেও মামলাটি দীর্ঘদিন আলোচনায় ছিল। একসময় জাতীয় দলের নিয়মিত মুখ নাসির হোসেন মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে ব্যক্তিগত জীবন ও বিতর্কিত ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বেশি সংবাদ শিরোনামে উঠে আসেন। এর আগে দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত অভিযোগেও তিনি সাময়িকভাবে ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন।

এদিকে রায়কে কেন্দ্র করে আদালতপাড়ায় নিরাপত্তা জোরদার করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মামলাটির রায় নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এখন সবার নজর আদালতের দিকে—বহুল আলোচিত এ মামলায় শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই দেখার অপেক্ষা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

তালাক ছাড়াই বিয়ে মামলা

Update Time : ০৯:৩৪:৪৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

নাসির-তামিমার ভাগ্য নির্ধারণ ১০ জুন, নজরে দেশজুড়ে আলোচিত সেই মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক-প্রান্তিক।

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক তারকা ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা সুলতানার বিরুদ্ধে করা বহুল আলোচিত ‘তালাক ছাড়াই বিয়ে’ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে ১০ জুন। ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত এ রায় দেবেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, সামাজিক বিতর্ক এবং গণমাধ্যমের ব্যাপক আলোচনার পর মামলাটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইসরাত হাসান জানিয়েছেন, মামলায় আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করেন এবং আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করছেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং নাসির ও তামিমাকে খালাস দেওয়া উচিত।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ব্যবসায়ী রাকিব হাসানের সঙ্গে তামিমা সুলতানার বিয়ে হয়। তাদের সংসারে একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, রাকিবের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় ২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাসির হোসেনকে বিয়ে করেন।

পরবর্তীতে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাসির ও তামিমার বিয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। রাকিব হাসান দাবি করেন, তাকে তালাক না দিয়েই তামিমা দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলা দায়ের করেন।

তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক শেখ মিজানুর রহমান ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে নাসির হোসেন, তামিমা সুলতানা এবং তামিমার মাকে অভিযুক্ত করা হয়। পরে ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আদালত নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন।

মামলাটি শুরু থেকেই ব্যাপক আলোচিত ছিল। কারণ, একদিকে জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার হিসেবে নাসির হোসেন দীর্ঘদিন জনপ্রিয় মুখ ছিলেন, অন্যদিকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারিবারিক বিরোধ এবং আইনি প্রশ্ন একসঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ায় ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়।

বিচার চলাকালে আদালত মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ২০২৩ সালের ২০ মার্চ বাদী রাকিব হাসানের সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয় এবং চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। গত ১০ মার্চ আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে নাসির ও তামিমা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।

গত ৬ মে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের জন্য ১০ জুন দিন ধার্য করেন। শুনানির সময় নাসির ও তামিমা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

আইনজীবীরা জানিয়েছেন, মামলায় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে নাসির হোসেন সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। অন্যদিকে তামিমা সুলতানার বিরুদ্ধে আনা একাধিক ধারায় সর্বোচ্চ ২১ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ মামলার রায় শুধু একটি পারিবারিক বিরোধের নিষ্পত্তিই নয়, বরং মুসলিম পারিবারিক আইন, বিবাহ নিবন্ধন এবং দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে তালাক কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া, নথিপত্রের বৈধতা এবং বিবাহের আইনি অবস্থান নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ক্রিকেট অঙ্গনেও মামলাটি দীর্ঘদিন আলোচনায় ছিল। একসময় জাতীয় দলের নিয়মিত মুখ নাসির হোসেন মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে ব্যক্তিগত জীবন ও বিতর্কিত ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বেশি সংবাদ শিরোনামে উঠে আসেন। এর আগে দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত অভিযোগেও তিনি সাময়িকভাবে ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন।

এদিকে রায়কে কেন্দ্র করে আদালতপাড়ায় নিরাপত্তা জোরদার করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মামলাটির রায় নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এখন সবার নজর আদালতের দিকে—বহুল আলোচিত এ মামলায় শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই দেখার অপেক্ষা।