মোঃ রওশন আলী – বিশেষ প্রতিনিধি,প্রান্তিক।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় সাপের কামড়ে এক যুবকের মৃত্যুকে ঘিরে চিকিৎসা ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও জরুরি সেবার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে নেওয়ার পরও সময়মতো অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা হয়নি। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোগীর শরীরে সাপের কামড়ের সুস্পষ্ট আলামত না পাওয়ায় প্রাথমিকভাবে পরিস্থিতি ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল।
নিহত রুহান মোল্লা (২৬) সাঁথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুর ইউনিয়নের চরকাবাড়ি কোলা গ্রামের বাসিন্দা। পারিবারিক সূত্র জানায়, রাতে বাড়ির পাশের জলাশয়ে টেঁটা দিয়ে মাছ ধরতে গেলে তিনি বিষধর সাপের কামড়ের শিকার হন। অসুস্থ হয়ে পড়লে স্বজনরা দ্রুত তাকে সাঁথিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
অভিযোগের কেন্দ্রে অ্যান্টিভেনম
রুহানের স্বজনদের দাবি, হাসপাতালে ভর্তি করার সময়ই চিকিৎসকদের জানানো হয়েছিল যে তিনি সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু তাদের অভিযোগ, হাসপাতালের মজুত থাকা সত্ত্বেও রোগীকে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়নি।
নিহতের বাবা হেলাল মোল্লার ভাষ্য, চিকিৎসায় বিলম্বই তার ছেলের মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
পরিবারের অভিযোগ, রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলেও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি। পরে তাকে পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলেও পথেই তার মৃত্যু হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা
অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোগীকে পর্যবেক্ষণের সময় সাপের কামড়ের সুস্পষ্ট কোনো চিহ্ন প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি। ফলে চিকিৎসকরা রোগের প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম পর্যাপ্ত পরিমাণে সংরক্ষিত রয়েছে এবং সাপের কামড় নিশ্চিত হলে নিয়ম অনুযায়ী তা প্রয়োগ করা হয়। তাদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সাপের কামড়: সময়ই সবচেয়ে বড় অস্ত্র
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে গ্রামীণ এলাকায় ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিষধর সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ রোগীর জীবন বাঁচানোর প্রধান উপায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় কামড়ের চিহ্ন স্পষ্ট না থাকলেও রোগীর উপসর্গ, ঘটনার বর্ণনা এবং ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ফলে এ ধরনের ঘটনায় চিকিৎসা প্রোটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
প্রশ্নের মুখে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা
রুহান মোল্লার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোকের কারণ নয়; এটি গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। জরুরি চিকিৎসা, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসক-স্বজন যোগাযোগ এবং অ্যান্টিভেনম ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই এখন আলোচনায়।
স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। এতে একদিকে যেমন পরিবারের অভিযোগের সত্যতা যাচাই হবে, অন্যদিকে হাসপাতালের ভূমিকা সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
উত্তরহীন কয়েকটি প্রশ্ন
- রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কত সময়ের মধ্যে চিকিৎসা শুরু হয়েছিল?
- সাপের কামড় সন্দেহ করা সত্ত্বেও কেন অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়নি?
- চিকিৎসা প্রোটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি?
- রেফার করার সিদ্ধান্ত কি যথাসময়ে নেওয়া হয়েছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই রুহান মোল্লার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
সাঁথিয়ার এই ঘটনায় একদিকে রয়েছে স্বজনদের চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ, অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থন। কিন্তু বিতর্কের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে একটি তরুণ প্রাণের গল্প। তাই আবেগ নয়, তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ তদন্তই পারে এই মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করতে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপের পথ দেখাতে।
মোঃ রওশন আলী - বিশেষ প্রতিনিধি,প্রান্তিক। 
















