Dhaka ০৩:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্যারাগুয়েকে বিধ্বস্ত করে বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের দাপুটে সূচনা

ব্যালোগুনের জোড়া গোল, পুলিসিচের নৈপুণ্য, রেইনার জাদুকরী ফিনিশ—স্বপ্নের শুরু স্বাগতিকদের

লস অ্যাঞ্জেলেসের রাতটি ছিল লাল-সাদা-নীল উল্লাসে মোড়া। গ্যালারিজুড়ে গর্জন, মাঠজুড়ে গতি আর আক্রমণের ঝড়। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই শক্তিশালী বার্তা দিল স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র—তারা কেবল আয়োজক নয়, শিরোপার লড়াইয়েও নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে এসেছে।

গ্রুপ ‘ডি’-এর ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে মরিসিও পচেত্তিনোর দল। স্কোরলাইন যতটা বড়, মাঠের ব্যবধান ছিল তারও বেশি।

খেলা শুরুর পর থেকেই প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগকে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। মাত্র সপ্তম মিনিটেই আসে প্রথম ধাক্কা। আক্রমণের সূচনা করেন অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ। দুরন্ত গতিতে দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে তিনি বল বাড়ান ওয়েস্টন ম্যাককেনির কাছে। ম্যাককেনির কাটব্যাক ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল জড়িয়ে দেন ড্যামিয়ান বোবাদিয়া। আত্মঘাতী সেই গোলেই শুরু হয় প্যারাগুয়ের দুঃস্বপ্ন।

গোলের পর আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। ২৮ মিনিটে ফোলারিন ব্যালোগুন বল জালে পাঠালেও অফসাইডের পতাকা তাকে হতাশ করে। কিন্তু সেই হতাশা স্থায়ী হয়নি তিন মিনিটও।

৩১তম মিনিটে পুলিসিচের নিখুঁত পাস ধরে বজ্রগতির শটে গোল করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ব্যালোগুন। গ্যালারি তখন উৎসবমুখর, আর প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগ যেন দিশেহারা।

প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই আসে আরেকটি সৌন্দর্যমণ্ডিত গোল। মালিক টিলম্যানের চমৎকার থ্রু বল পেয়ে ডিফেন্ডার ওমার আলদেরেতে-কে পেছনে ফেলে বেরিয়ে যান ব্যালোগুন। এরপর গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের মাথার ওপর দিয়ে অসাধারণ চিপ শটে বল জালে জড়িয়ে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন তিনি। স্কোরলাইন তখন ৩-০—ম্যাচ কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের মুঠোয়।

বিরতির পর প্যারাগুয়ে কিছুটা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। ৬৫তম মিনিটে হুলিও এনসিসোর পাস থেকে মৌরিসিও গোল করে ব্যবধান কমান। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল ম্যাচে হয়তো নতুন নাটকীয়তা আসতে পারে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই সম্ভাবনাও দ্রুত নিভিয়ে দেয়।

যোগ করা সময়ের শেষ মুহূর্তে আসে ম্যাচের সেরা দৃশ্য। বদলি হিসেবে নামা জিওভান্নি রেইনা প্রায় ২০ গজ দূর থেকে ডান পায়ের বাইরের অংশে এমন এক বাঁকানো শট নেন, যা মুহূর্তেই দর্শকদের দাঁড় করিয়ে দেয়। বল জালে জড়াতেই স্টেডিয়াম বিস্ফোরিত হয় উল্লাসে। সেই গোল যেন শুধু স্কোরলাইন নয়, পুরো ম্যাচের প্রতীক—সাহসী, নান্দনিক এবং কর্তৃত্বপূর্ণ।

এই জয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসেও একটি বিশেষ কীর্তি গড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফোলারিন ব্যালোগুন হলেন মাত্র দ্বিতীয় মার্কিন ফুটবলার, যিনি বিশ্বকাপের এক ম্যাচে একাধিক গোল করেছেন। এর আগে ১৯৩০ সালে প্যারাগুয়ের বিপক্ষেই হ্যাটট্রিক করেছিলেন কিংবদন্তি বার্ট প্যাটেনড।

৯৬ বছরের ব্যবধানে আবারও প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ইতিহাসের পাতা রাঙাল যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে এটি বিশ্বকাপে তাদের সবচেয়ে বড় জয়গুলোর একটি।

প্রথম ম্যাচেই এমন দাপুটে পারফরম্যান্সে স্বাগতিকদের সমর্থকদের মনে নতুন স্বপ্ন জাগছে। পুলিসিচের নেতৃত্ব, ব্যালোগুনের ধারালো ফিনিশিং, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং রেইনার সৃজনশীলতা—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেন ঘোষণা করে দিল, বিশ্বকাপের এই আসরে তারা কেবল অংশ নিতে আসেনি; এসেছে ইতিহাস লিখতে।

অন্যদিকে প্যারাগুয়ের জন্য এটি সতর্কবার্তা। সামনে টিকে থাকতে হলে রক্ষণভাগের দুর্বলতা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে। কারণ বিশ্বকাপের মঞ্চে দ্বিতীয় সুযোগ খুব কমই আসে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

২৫ বছর কারাভোগের পর মুক্তি, দেড় মাসের মাথায় গুলিবিদ্ধ ‘কাইল্লা পলাশ’

প্যারাগুয়েকে বিধ্বস্ত করে বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের দাপুটে সূচনা

Update Time : ০৫:৫২:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

ব্যালোগুনের জোড়া গোল, পুলিসিচের নৈপুণ্য, রেইনার জাদুকরী ফিনিশ—স্বপ্নের শুরু স্বাগতিকদের

লস অ্যাঞ্জেলেসের রাতটি ছিল লাল-সাদা-নীল উল্লাসে মোড়া। গ্যালারিজুড়ে গর্জন, মাঠজুড়ে গতি আর আক্রমণের ঝড়। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই শক্তিশালী বার্তা দিল স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র—তারা কেবল আয়োজক নয়, শিরোপার লড়াইয়েও নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে এসেছে।

গ্রুপ ‘ডি’-এর ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে মরিসিও পচেত্তিনোর দল। স্কোরলাইন যতটা বড়, মাঠের ব্যবধান ছিল তারও বেশি।

খেলা শুরুর পর থেকেই প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগকে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। মাত্র সপ্তম মিনিটেই আসে প্রথম ধাক্কা। আক্রমণের সূচনা করেন অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ। দুরন্ত গতিতে দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে তিনি বল বাড়ান ওয়েস্টন ম্যাককেনির কাছে। ম্যাককেনির কাটব্যাক ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল জড়িয়ে দেন ড্যামিয়ান বোবাদিয়া। আত্মঘাতী সেই গোলেই শুরু হয় প্যারাগুয়ের দুঃস্বপ্ন।

গোলের পর আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। ২৮ মিনিটে ফোলারিন ব্যালোগুন বল জালে পাঠালেও অফসাইডের পতাকা তাকে হতাশ করে। কিন্তু সেই হতাশা স্থায়ী হয়নি তিন মিনিটও।

৩১তম মিনিটে পুলিসিচের নিখুঁত পাস ধরে বজ্রগতির শটে গোল করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ব্যালোগুন। গ্যালারি তখন উৎসবমুখর, আর প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগ যেন দিশেহারা।

প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই আসে আরেকটি সৌন্দর্যমণ্ডিত গোল। মালিক টিলম্যানের চমৎকার থ্রু বল পেয়ে ডিফেন্ডার ওমার আলদেরেতে-কে পেছনে ফেলে বেরিয়ে যান ব্যালোগুন। এরপর গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের মাথার ওপর দিয়ে অসাধারণ চিপ শটে বল জালে জড়িয়ে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন তিনি। স্কোরলাইন তখন ৩-০—ম্যাচ কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের মুঠোয়।

বিরতির পর প্যারাগুয়ে কিছুটা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। ৬৫তম মিনিটে হুলিও এনসিসোর পাস থেকে মৌরিসিও গোল করে ব্যবধান কমান। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল ম্যাচে হয়তো নতুন নাটকীয়তা আসতে পারে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই সম্ভাবনাও দ্রুত নিভিয়ে দেয়।

যোগ করা সময়ের শেষ মুহূর্তে আসে ম্যাচের সেরা দৃশ্য। বদলি হিসেবে নামা জিওভান্নি রেইনা প্রায় ২০ গজ দূর থেকে ডান পায়ের বাইরের অংশে এমন এক বাঁকানো শট নেন, যা মুহূর্তেই দর্শকদের দাঁড় করিয়ে দেয়। বল জালে জড়াতেই স্টেডিয়াম বিস্ফোরিত হয় উল্লাসে। সেই গোল যেন শুধু স্কোরলাইন নয়, পুরো ম্যাচের প্রতীক—সাহসী, নান্দনিক এবং কর্তৃত্বপূর্ণ।

এই জয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসেও একটি বিশেষ কীর্তি গড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফোলারিন ব্যালোগুন হলেন মাত্র দ্বিতীয় মার্কিন ফুটবলার, যিনি বিশ্বকাপের এক ম্যাচে একাধিক গোল করেছেন। এর আগে ১৯৩০ সালে প্যারাগুয়ের বিপক্ষেই হ্যাটট্রিক করেছিলেন কিংবদন্তি বার্ট প্যাটেনড।

৯৬ বছরের ব্যবধানে আবারও প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ইতিহাসের পাতা রাঙাল যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে এটি বিশ্বকাপে তাদের সবচেয়ে বড় জয়গুলোর একটি।

প্রথম ম্যাচেই এমন দাপুটে পারফরম্যান্সে স্বাগতিকদের সমর্থকদের মনে নতুন স্বপ্ন জাগছে। পুলিসিচের নেতৃত্ব, ব্যালোগুনের ধারালো ফিনিশিং, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং রেইনার সৃজনশীলতা—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেন ঘোষণা করে দিল, বিশ্বকাপের এই আসরে তারা কেবল অংশ নিতে আসেনি; এসেছে ইতিহাস লিখতে।

অন্যদিকে প্যারাগুয়ের জন্য এটি সতর্কবার্তা। সামনে টিকে থাকতে হলে রক্ষণভাগের দুর্বলতা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে। কারণ বিশ্বকাপের মঞ্চে দ্বিতীয় সুযোগ খুব কমই আসে।