বিশেষ প্রতিবেদনঃ
অদ্য ৯ জিলহজ, পবিত্র হজের দিবস। আরাফাতের ময়দানে সমবেত হইয়াছেন ১৬ লক্ষাধিক হজযাত্রী। লক্ষ লক্ষ কণ্ঠে ধ্বনিত হইতেছে—‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক।’”
আরবের সেই দিগন্তবিস্তৃত প্রান্তর—যেখানে দিনের সূর্য যেন অগ্নিশিখা হাতে পৃথিবীর বুকে অবতীর্ণ হয়, যেখানে রাতের নক্ষত্রেরা নিঃসঙ্গতার অশ্রুবিন্দুর ন্যায় আকাশে ঝুলিয়া থাকে—সেই নির্জন মরুভূমিতে একদিন ইতিহাসের নয়, প্রেমের; সংসারের নয়, আত্মসমর্পণের; রক্তের নয়, ঈমানের এক অনন্ত কাব্য রচিত হইয়াছিল।
মানবহৃদয়ের সকল স্নেহ, মমতা ও পার্থিব আকাঙ্ক্ষাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্ত উৎসর্গ করিবার যে অপূর্ব দৃষ্টান্ত, তাহার নাম—ইব্রাহিম (আ.)।
মরুভূমির নিঃসঙ্গ প্রহর
হাজেরা!
এক নিরুপায় জননী।
বক্ষের দুধে শিশুপুত্রের জীবনধারা বহন করিতেছেন; অথচ চারিদিকে মৃত্যুসম নীরবতা। না কোনো বৃক্ষ, না কোনো কূপ, না কোনো মানবকণ্ঠ। কেবল উত্তপ্ত বালুকারাশি, শুষ্ক পাহাড়, আর অসীম আকাশের স্তব্ধতা।
ইব্রাহিম (আ.) যখন স্ত্রী ও শিশু-পুত্রকে সেই অনাবাদী উপত্যকায় রাখিয়া ফিরিয়া চলিলেন, তখন হাজেরার হৃদয় যেন বিদীর্ণ হইয়া গেল।
তিনি ডাকিলেন—
“হে ইব্রাহিম! আমাদের কাহার নিকট রাখিয়া চলিয়াছেন?”
কোনো উত্তর নাই।
আবার ডাকিলেন—
“এ কি আল্লাহর আদেশ?”
ইব্রাহিম (আ.) নীরবে সম্মতি দিলেন।
তখন সেই মহীয়সী নারী বলিলেন—
“তবে তিনি আমাদের বিনষ্ট করিবেন না।”
হায়! বিশ্বাসের এ কিরূপ দীপ্তি!
যেখানে পৃথিবীর সকল যুক্তি নিঃশেষ হয়, সেখানে ঈমানের প্রদীপ জ্বলিয়া উঠে।
পবিত্র কোরআনে ইব্রাহিম (আ.)-এর আর্ত দোয়া ধ্বনিত হইয়াছে—
“হে আমাদের পালনকর্তা! আমি আমার সন্তানদের তোমার সম্মানিত গৃহের নিকট এক অনাবাদী উপত্যকায় বসবাস করাইলাম, যাতে তাহারা সালাত কায়েম করে।”
— সুরা ইবরাহিম : ৩৭|
মাতৃত্বের আর্তনাদ ও জমজমের উৎসঃ
তৃষ্ণায় যখন শিশু ইসমাঈলের ওষ্ঠ শুকাইয়া আসিল, তখন মাতৃহৃদয় আর স্থির থাকিতে পারিল না। হাজেরা সাফা হইতে মারওয়া, মারওয়া হইতে সাফা—উন্মত্তিনীর ন্যায় দৌড়াইতে লাগিলেন।
সেই দৌড় কেবল পানির অনুসন্ধান ছিল না; উহা ছিল মাতৃত্বের আর্তনাদ, বিশ্বাসের ক্রন্দন।
আকাশ নিশ্চুপ।
পৃথিবী নিশ্চুপ।
কিন্তু আল্লাহ নিশ্চুপ ছিলেন না।
শিশু ইসমাঈলের পদাঘাতে মরুভূমির বক্ষ বিদীর্ণ হইয়া রহমতের ধারা উৎসারিত হইল—জমজম!
যে মরুভূমি মৃত্যুর প্রতীক ছিল, তাহাই জীবনধারার উৎসে পরিণত হইল।
কাবাঘরের নির্মাণ: পিতা-পুত্রের অশ্রুসিক্ত শ্রম
কালক্রমে ইসমাঈল (আ.) যুবকে পরিণত হইলেন। তখন আল্লাহর নির্দেশে পিতা-পুত্র মিলিয়া কাবাঘরের ভিত্তি স্থাপন করিতে লাগিলেন।
ইব্রাহিম পাথর তুলিতেছেন, ইসমাঈল তাহা বহন করিতেছেন। আর উভয়ের কণ্ঠে ধ্বনিত হইতেছে বিনম্র প্রার্থনা—
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পক্ষ হইতে কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
— সুরা আল-বাকারাহ : ১২৭
ইহা কোনো প্রাসাদ নির্মাণ ছিল না; ইহা ছিল মানবজাতির হৃদয়ের কেন্দ্র নির্মাণ।
ইব্রাহিমের আযান
অতঃপর আল্লাহ বলিলেন—
“মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা করো; তাহারা তোমার নিকট আসিবে পদব্রজে ও দূর-দূরান্ত হইতে উটের পৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া।”
— সুরা আল-হজ : ২৭
ইব্রাহিম (আ.) বিস্ময়ে বলিলেন—
“হে প্রভু! এই নির্জন মরুভূমিতে আমার কণ্ঠ কে শুনিবে?”
আল্লাহ বলিলেন—
“তুমি ডাক দাও; পৌঁছাইবার দায়িত্ব আমার।”
অতঃপর তিনি পর্বতচূড়ায় দাঁড়াইয়া আহ্বান করিলেন—
“হে মানবজাতি! তোমাদের প্রতিপালকের গৃহে উপস্থিত হও।”
সেই ধ্বনি যুগে যুগে প্রতিধ্বনিত হইয়া আজও কোটি প্রাণকে কাঁদাইয়া তোলে—
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক!”
স্বপ্নের ভিতর রক্তাক্ত পরীক্ষা
কিন্তু প্রেমের সর্বোচ্চ পরীক্ষা তখনও অবশিষ্ট ছিল।
এক রজনী।
নক্ষত্রময় নিস্তব্ধ আকাশ।
আর সেই রাত্রির গভীরে ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্ন দেখিলেন—তিনি নিজ হাতে পুত্র ইসমাঈলকে কোরবানি করিতেছেন।
জাগিয়া উঠিয়া তিনি স্তব্ধ হইয়া গেলেন।
এ কেমন আদেশ?
যে সন্তান বৃদ্ধ বয়সে প্রাপ্ত, যাহার হাসিতে গৃহ আলোকিত, তাহাকেই কি উৎসর্গ করিতে হইবে?
কিন্তু নবীর হৃদয়ে দ্বিধা থাকে না।
তিনি পুত্রকে বলিলেন—
“হে আমার পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখিয়াছি যে, তোমাকে জবেহ করিতেছি; এখন তোমার অভিমত কী?”
— সুরা আস-সাফফাত : ১০২
ইসমাঈল!
কী অপূর্ব সেই কিশোর!
তিনি বলিলেন—
“হে আমার পিতা! আপনাকে যাহা আদেশ করা হইয়াছে, তাহাই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাইবেন।”
হায়! পিতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, পুত্রও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ!
শয়তানের কুপ্ররোচনা
যখন পিতা-পুত্র মিনার পথে অগ্রসর হইতেছিলেন, তখন শয়তান আসিয়া কানে কানে কহিতে লাগিল—
“এ কেমন নিষ্ঠুরতা?”
“নিজ সন্তানের রক্তে কি ঈশ্বর সন্তুষ্ট হন?”
“ফিরিয়া যাও!”
কিন্তু ইব্রাহিম (আ.) শয়তানের দিকে পাথর নিক্ষেপ করিলেন।
হাজেরা (আ.)-কেও সে বিভ্রান্ত করিতে চাহিল, ইসমাঈল (আ.)-কেও দুর্বল করিতে চাহিল; কিন্তু ঈমানের দুর্গ ভেদ করিতে পারিল না।
আজ মিনায় জামারাতে পাথর নিক্ষেপ সেই চিরন্তন বিদ্রোহের স্মারক—অসত্য, প্রবৃত্তি ও শয়তানি প্ররোচনার বিরুদ্ধে মানুষের ঘোষণা।
কোরবানির মহামুহূর্তঃ
অতঃপর সেই মুহূর্ত উপস্থিত হইল।
পিতা পুত্রকে শুইয়ে দিলেন।
ছুরির ধার চকচক করিতেছে।
আকাশ স্তব্ধ।
পৃথিবী নিস্তব্ধ।
ফেরেশতাগণ যেন নিশ্বাস বন্ধ করিয়া অপেক্ষা করিতেছেন।
ঠিক তখনই রহমতের দরজা খুলিয়া গেল।
আল্লাহ ঘোষণা করিলেন—
“হে ইব্রাহিম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করিয়াছ।”
— সুরা আস-সাফফাত : ১০৫
অতঃপর—
“আমি তাহাকে এক মহান কোরবানির বিনিময়ে মুক্ত করিলাম।”
— সুরা আস-সাফফাত : ১০৭
ইসমাঈলের পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি করা হইল।
মানব ইতিহাসে এই প্রথম প্রমাণিত হইল—আল্লাহ রক্ত চান না; তিনি চান হৃদয়ের আনুগত্য।
আজও সেই আহ্বান বহমান।
হজের প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতা সেই পরিবারের স্মৃতি বহন করে। সাঈ স্মরণ করায় হাজেরার ছুটে চলা; জমজম স্মরণ করায় রহমতের অলৌকিকতা; জামারা স্মরণ করায় শয়তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; আর কোরবানি স্মরণ করায়—প্রিয়তম জিনিসও আল্লাহর পথে উৎসর্গ করিতে হয়।
এইজন্যই ইব্রাহিমের কাহিনি কেবল ধর্মীয় ইতিহাস নহে; উহা মানবআত্মার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেমকাব্য।
বিশেষ প্রতিবেদন 



















