Dhaka ০১:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাঁচুরিয়া: সম্ভাবনার গ্রাম থেকে মাদকের ছোবলে ক্ষতবিক্ষত এক জনপদ


একসময় সম্ভাবনা, ঐতিহ্য ও সামাজিক শৃঙ্খলার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল পাঁচুরিয়া গ্রাম। গ্রাম্য সালিশ ও বিচারব্যবস্থার সুনাম ছড়িয়ে ছিল আশপাশের সাত-আটটি গ্রামেও। কৃষিনির্ভর এ জনপদের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। কাগেশ্বরী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা গ্রামটি দুটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। নদীটি এখানকার বহু মানুষের জীবিকার উৎস; অনেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন।
গ্রামটিতে রয়েছে পাঁচটি মসজিদ, একটি দাখিল মাদ্রাসা, একটি কওমি মাদ্রাসা এবং একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দাখিল মাদ্রাসার পাশেই গড়ে উঠেছে স্থানীয় বাজার, যেখানে অনেক ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা জীবিকা নির্বাহ করেন। সব মিলিয়ে শান্ত, সুন্দর ও সম্ভাবনাময় একটি জনপদ হিসেবেই পরিচিত ছিল পাঁচুরিয়া।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আজ গ্রামটি মাদকের ভয়াল ছোবলে গভীর সংকটের মুখে। বাইরে থেকে দেখলে সবুজ মাঠ, কৃষিজমি আর ব্যস্ত মানুষের জীবন দেখে এখনো শান্তির গ্রাম বলেই মনে হয়। কিন্তু ভেতরের বাস্তবতা ভিন্ন।


যে খেলার মাঠ একসময় শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্র ছিল, সেখানে এখন খেলাধুলার পাশাপাশি মাদকের ছায়াও বিস্তার লাভ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ সহজেই মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। একসময় যারা মাঠে খেলাধুলা করে নিজেদের স্বপ্ন গড়ত, তাদেরই কেউ কেউ আজ মাদকের করাল গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে।


প্রতিদিন ভোরে কৃষকেরা কাস্তে হাতে মাঠে যান, সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন। কিন্তু অনেক পরিবারকে এখন এমন এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যেখানে পরিশ্রমের শেষে ঘরে ফিরে জানতে হচ্ছে—তাদের সন্তান মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়েছে। এটি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো গ্রামের জন্যই গভীর উদ্বেগ ও বেদনার বিষয়।
প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সচেতন মানুষের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কেন মাদক ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। অনেকের মতে, সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল হওয়ায় এবং প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির ছত্রছায়ায় মাদক ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “গ্রামে কারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তা কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু তাদের প্রভাব ও ভয়ের কারণে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না। ফলে মাদক ব্যবসা দিন দিন আরও বিস্তার লাভ করছে।”
তবে আশার কথা, এখনো গ্রামে অনেক সচেতন মানুষ রয়েছেন, যারা মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চান। তাদের বিশ্বাস, প্রশাসনের কঠোর অভিযান, জনপ্রতিনিধিদের আন্তরিক ভূমিকা, অভিভাবকদের সচেতনতা, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই পারে পাঁচুরিয়াকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে।


মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না; ধ্বংস করে একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং পুরো সমাজকে। তাই এখনই সময় সম্মিলিতভাবে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। পাঁচুরিয়া আবারও সম্ভাবনা, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির গ্রাম হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াক—এটাই এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

৩ শর্তে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স পুনর্বহাল: চালু হলো সব চিকিৎসাসেবা

পাঁচুরিয়া: সম্ভাবনার গ্রাম থেকে মাদকের ছোবলে ক্ষতবিক্ষত এক জনপদ

Update Time : ০৫:২৮:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬


একসময় সম্ভাবনা, ঐতিহ্য ও সামাজিক শৃঙ্খলার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল পাঁচুরিয়া গ্রাম। গ্রাম্য সালিশ ও বিচারব্যবস্থার সুনাম ছড়িয়ে ছিল আশপাশের সাত-আটটি গ্রামেও। কৃষিনির্ভর এ জনপদের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। কাগেশ্বরী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা গ্রামটি দুটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। নদীটি এখানকার বহু মানুষের জীবিকার উৎস; অনেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন।
গ্রামটিতে রয়েছে পাঁচটি মসজিদ, একটি দাখিল মাদ্রাসা, একটি কওমি মাদ্রাসা এবং একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দাখিল মাদ্রাসার পাশেই গড়ে উঠেছে স্থানীয় বাজার, যেখানে অনেক ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা জীবিকা নির্বাহ করেন। সব মিলিয়ে শান্ত, সুন্দর ও সম্ভাবনাময় একটি জনপদ হিসেবেই পরিচিত ছিল পাঁচুরিয়া।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আজ গ্রামটি মাদকের ভয়াল ছোবলে গভীর সংকটের মুখে। বাইরে থেকে দেখলে সবুজ মাঠ, কৃষিজমি আর ব্যস্ত মানুষের জীবন দেখে এখনো শান্তির গ্রাম বলেই মনে হয়। কিন্তু ভেতরের বাস্তবতা ভিন্ন।


যে খেলার মাঠ একসময় শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্র ছিল, সেখানে এখন খেলাধুলার পাশাপাশি মাদকের ছায়াও বিস্তার লাভ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ সহজেই মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। একসময় যারা মাঠে খেলাধুলা করে নিজেদের স্বপ্ন গড়ত, তাদেরই কেউ কেউ আজ মাদকের করাল গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে।


প্রতিদিন ভোরে কৃষকেরা কাস্তে হাতে মাঠে যান, সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন। কিন্তু অনেক পরিবারকে এখন এমন এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যেখানে পরিশ্রমের শেষে ঘরে ফিরে জানতে হচ্ছে—তাদের সন্তান মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়েছে। এটি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো গ্রামের জন্যই গভীর উদ্বেগ ও বেদনার বিষয়।
প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সচেতন মানুষের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কেন মাদক ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। অনেকের মতে, সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল হওয়ায় এবং প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির ছত্রছায়ায় মাদক ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “গ্রামে কারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তা কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু তাদের প্রভাব ও ভয়ের কারণে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না। ফলে মাদক ব্যবসা দিন দিন আরও বিস্তার লাভ করছে।”
তবে আশার কথা, এখনো গ্রামে অনেক সচেতন মানুষ রয়েছেন, যারা মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চান। তাদের বিশ্বাস, প্রশাসনের কঠোর অভিযান, জনপ্রতিনিধিদের আন্তরিক ভূমিকা, অভিভাবকদের সচেতনতা, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই পারে পাঁচুরিয়াকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে।


মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না; ধ্বংস করে একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং পুরো সমাজকে। তাই এখনই সময় সম্মিলিতভাবে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। পাঁচুরিয়া আবারও সম্ভাবনা, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির গ্রাম হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াক—এটাই এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।