নিজস্ব প্রতিবেদক-দৈনিক প্রান্তিক,ঢাকা |
বিগত সরকারের সময়ে পুলিশে ‘দলীয় ভিত্তিতে’ নিয়োগের অভিযোগের তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তদন্ত শেষ হলে এ-সংক্রান্ত তথ্য জাতির সামনে প্রকাশ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জয়নুল আবদিন ফারুক জানতে চান, বিগত ১৭ বছরে ‘দলীয়ভাবে’ পুলিশে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে কি না। একই সঙ্গে বিভিন্ন আন্দোলনের সময় লুট হওয়া অস্ত্রের সংখ্যা ও সেগুলো উদ্ধারের অগ্রগতির বিষয়েও জানতে চান তিনি।
জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত সরকারের সময়ে দলীয় ভিত্তিতে পুলিশে নিয়োগের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। কয়েকটি জেলায় পুলিশ নিয়োগে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের সময়ে কয়েকটি জেলা থেকে হাজার হাজার কনস্টেবল, উপপরিদর্শক (এসআই) ও অন্যান্য পদে লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, জেলা কোটার সুবিধা নিতে অনেকে প্রকৃত স্থায়ী বাসিন্দা না হয়েও সংশ্লিষ্ট জেলায় জমি কিনে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করেছেন।
তিনি বলেন, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও কিশোরগঞ্জসহ কয়েকটি জেলা তদন্তে বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব জেলায় প্রকৃত বাসিন্দা না হয়েও একখণ্ড জমি কিনে গ্রামের ঠিকানা ও স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেকে জেলা কোটার সুবিধা নিয়েছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা তদন্ত করে একটা পর্যায়ে এসেছি। সেটা যখন ফাইনাল হবে, আমরা জাতির সামনে উন্মুক্ত করব।’
লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান
বিভিন্ন আন্দোলনের সময় লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চলছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অভিযানে লুট হওয়া কিছু অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের নম্বর মিলিয়ে তা লুট হওয়া অস্ত্র কি না শনাক্ত করা হচ্ছে। শনাক্ত হওয়ার পর সংবাদমাধ্যম ও প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে তা জানানো হচ্ছে।
লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আলাদা কমিটি করা হয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে এ বিষয়ে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। কারাগারসহ বিভিন্ন স্থান থেকে লুট হওয়া অস্ত্রও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশে নতুন ১৪ হাজার ৪০০ পদ
পুলিশের জনবল সংকট কাটাতে নতুন করে ৪ হাজার নিরস্ত্র এসআই, ৪০০ সার্জেন্ট ও ১০ হাজার কনস্টেবল পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমিনের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। এসব পদ সৃষ্টি হলে রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের জনবল বাড়বে বলে জানান তিনি।
পুলিশের যানবাহন ও জলযানের ঘাটতি পূরণেও সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে পুলিশের অনুমোদিত জনবল ও সরঞ্জাম কাঠামো অনুযায়ী যানবাহন ও জলযানের ঘাটতি রাজস্ব বাজেট থেকে পূরণ করা হবে। নতুন ইউনিট, জনবল ও কাজের পরিধি বাড়লে প্রয়োজন অনুযায়ী যানবাহন ও জলযানের সংখ্যাও বাড়ানো হবে।
পুলিশের প্রশিক্ষণে নৈতিক শিক্ষা, শারীরিক প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক বিষয় নিয়মিতভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে বলেও জানান তিনি। তবে আলাদাভাবে নৈতিক প্রশিক্ষণের জন্য বর্তমানে কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি
কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবুল হাসনাত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূরক প্রশ্ন করেন। বিভিন্ন অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানতে চান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যথাযথ ভূমিকা রাখতে পেরেছেন কি না।
জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না, তা দৃশ্যমান। বর্তমান সরকারের সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও কম সময়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ঢালাও বক্তব্যের পরিবর্তে নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্য সংসদে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার অভিযোগ থাকলে তা সংসদে উত্থাপন করা যেতে পারে। প্রয়োজনে কার্যপ্রণালি বিধির ৩০০ ধারায় তিনি বিবৃতি দেবেন বলেও জানান।
মব সহিংসতা কমেছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের একই সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তুলনামূলক তথ্যও তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মব বা সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতার ঘটনা ২০২৫ সালের একই সময়ের ৮৯টি থেকে চলতি বছরে ৫৬টিতে নেমেছে।
সংখ্যালঘুদের ঘিরে ঘটনার সংখ্যাও ৯৯৯ থেকে কমে ১৬৩টিতে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এটিকে ‘বৈপ্লবিক উন্নতি’ না বললেও দৃশ্যমান ও জনপ্রত্যাশিত উন্নতি হয়েছে।
মব সহিংসতার বিষয়ে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অপরাধের বিচার করার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের। আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা বেআইনি এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
১৫ বছরে প্রায় ২০ হাজার আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স
জামালপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ১৯ হাজার ৬৪১ জনকে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে শটগানের লাইসেন্স ৭ হাজার ৩০৮টি, পিস্তল ৫ হাজার ৩৪৭টি, রিভলভার ৫৯৪টি, রাইফেল ৯৪৮টি এবং অন্যান্য ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ৫ হাজার ৪৪৪টি। ৬৪ জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয় থেকে বছরভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন হওয়ায় এ বিষয়ে আংশিক তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
মাদকবিরোধী অভিযান
বিএনপির সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে ৫৫ হাজার ২৫১টি অভিযান পরিচালনা করেছে।
এসব অভিযানে ১৬ হাজার ৩৭৩টি মামলা করা হয়েছে এবং ১৭ হাজার ১৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংসদকে জানান তিনি।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একই সঙ্গে পুলিশে অতীতের নিয়োগ-অনিয়মের তদন্ত, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের তথ্য তুলে ধরেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক-দৈনিক প্রান্তিক। 


















