আগস্টের ভরদুপুর। সাভারের আকাশ জুড়ে কড়া রোদের মেলা। সেই রোদের আলো এসে পড়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধের সাতটা সুউচ্চ মিনারের গায়ে। মিনারগুলো যেন একাত্তরের বীরত্ব আর ত্যাগের এক একটি জীবন্ত মহাকাব্য। গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের আলো-ঝলমলে চত্বরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে সপে দেওয়ার যে শপথ নতুন পাঁচ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী নিয়েছেন, আজ দুপুরে সাভারের এই পবিত্র মাটিতে পা রেখে যেন তা পূর্ণতা পেল।
দুপুর ঠিক একটা। চত্বরে এসে থামল নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের গাড়ি বহর। গাড়ি থেকে নামলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ এবং বিমান পরিবহন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তাঁদের পেছনে ধীর ও সুসংহত পায়ে এগিয়ে এলেন দুই নতুন প্রতিমন্ত্রী—হুমায়ুন কবির আর শামীম কায়সার লিংকন। সকলের পরনে ধবধবে সাদা খাদি ও সিল্কের পাঞ্জাবি। রোদচশমা ভেদ করে তাঁদের চোখেমুখে তখন দেশ গড়ার এক নতুন উদ্দীপনা, এক নতুন প্রত্যয়।
তাঁরা যখন শহীদ বেদির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, চারদিকের বাতাসে যেন এক অপার্থিব নীরবতা নেমে এল। একাত্তরে যে সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষ, কৃষক আর ছাত্ররা এই দেশের মাটির জন্য জীবন সপে দিয়েছিল, তাঁদের স্মরণে পাঁচজন নতুন কাণ্ডারি পরম শ্রদ্ধায় চোখ বন্ধ করলেন। এক মিনিট, দুই মিনিট… চারদিকের গাছপালা আর কংক্রিটের চত্বর যেন একাত্ম হয়ে গেল সেই মৌন শ্রদ্ধায়। বিউগলের করুণ সুর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই নতুন মন্ত্রীদের চেহারায় ফুটে উঠল এক ধরণের দৃঢ় সংকল্প। শহীদদের রক্তে ভেজা এই মাটিকে তাঁরা সমৃদ্ধির শিখরে নিয়ে যাবেন—এই গাম্ভীর্যই যেন প্রকাশ পাচ্ছিল তাঁদের মুখাবয়বে।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মন্ত্রীরা একে একে স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করলেন। কলমের প্রতিটি টানে মিশে রইল বীর শহীদদের স্বপ্নের আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণের দৃঢ় অঙ্গীকার।
বেশি সময় বসার সুযোগ নেই। দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে নিয়তির চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। সচিবালয়ের ফাইল আর জনগণের প্রত্যাশার চাপ অপেক্ষা করছে দপ্তরে দপ্তরে। শহীদদের প্রতি শেষবারের মতো বিনম্র দৃষ্টিপাত করে মন্ত্রীরা আবার গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। গাড়িগুলো এখন সাভারের ধুলো উড়িয়ে তীব্র গতিতে ছুটবে ঢাকার শেরেবাংলা নগরের দিকে। সেখানে চন্দ্রিমা উদ্যানে অপেক্ষা করছে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান দুই ব্যক্তিত্ব—জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার মাজার। সেখানে ফুল দেওয়া হবে, দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি কামনায় হাত তুলে মোনাজাত করা হবে।
রোদের তেজ আরও বাড়ে, আর সেই তপ্ত দুপুরের আলোয় নতুন সরকারের এই পাঁচ মন্ত্রীর যাত্রা যেন এক নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের উজ্জ্বল বার্তা দিয়ে যায়।
বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক প্রান্তিক, সাভার। 


















