দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের ঐতিহাসিক দরবার হলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করলেন মির্জা ফখরুল। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোটার হলেও ভোট দেন ৩৪৩ জন। ভোটগ্রহণ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন ফল ঘোষণা করেন এবং একই রাতে নির্বাচন কমিশন মির্জা ফখরুলকে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
রাষ্ট্রপতির শপথকে ঘিরে বঙ্গভবনে ছিল উৎসবমুখর ও ভাবগম্ভীর পরিবেশ। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং রাষ্ট্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গভবনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে, অনুষ্ঠানে ১ হাজার ২০০-এর বেশি অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
রাষ্ট্রপতির শপথের মধ্য দিয়ে শুধু একটি সাংবিধানিক পদে নতুন ব্যক্তির দায়িত্ব গ্রহণই সম্পন্ন হলো না; একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সমন্বয়েরও একটি দৃশ্যমান অধ্যায় তৈরি হলো। একদিকে নির্বাচিত সরকার ও সংসদীয় নেতৃত্ব, অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব—এই দুইয়ের সমন্বিত পথচলা আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাষ্ট্রের কোনো আনুষ্ঠানিকতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার সঙ্গে মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও প্রত্যাশার যোগসূত্র তৈরি হয়। বঙ্গভবনের দরবার হলে আজকের শপথ তাই কেবল রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।
রাষ্ট্রপতির শপথের পর একই রাতে বঙ্গভবনে সরকারের মন্ত্রিসভায় নতুন ছয় সদস্যের শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন সদস্যদের মধ্যে ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী, ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ তথ্যমন্ত্রী, সাচিং প্রু জেরী পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী এবং এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। অন্যদিকে হুমায়ুন কবির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবেন বলে জানানো হয়েছে।
মন্ত্রিসভার এই সম্প্রসারণকে সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোয় অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও বিভিন্ন অঞ্চলের অংশগ্রহণের সমন্বয়ের উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত সাচিং প্রু জেরীকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ও উন্নয়ন-প্রশাসনের প্রশ্নটি নতুন গুরুত্ব পেতে পারে। একইভাবে জোটের শরিক আন্দালিভ রহমান পার্থকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা রাজনৈতিক সমন্বয়ের একটি বার্তাও বহন করছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রপতির পদ মূলত সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হলেও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভারসাম্য, প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশে এই পদটির তাৎপর্য অনস্বীকার্য। ফলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর সামনে যেমন সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব থাকবে, তেমনি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের অভিভাবকসুলভ ভূমিকা পালনের প্রত্যাশাও থাকবে।
বাংলাদেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার চাকচিক্য নয়, চায় একটি কার্যকর রাষ্ট্র—যেখানে ভোটের মূল্য থাকবে, আইনের শাসন থাকবে, নাগরিকের মর্যাদা থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় সংকীর্ণতার বাইরে দাঁড়িয়ে জনগণের সেবা করবে। আজ বঙ্গভবনের দরবার হলে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো, তার প্রকৃত সার্থকতা নির্ধারিত হবে সেই প্রত্যাশাগুলো কতটা বাস্তব রূপ পায় তার ওপর।
নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ তাই একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বাংলাদেশের সামনে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার একটি প্রতীকী দরজা। সেই দরজা দিয়ে দেশ কতটা গণতন্ত্র, সুশাসন, ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারে—তার উত্তরই লিখবে আগামী দিনের বাংলাদেশ।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন সম্পাদক ,দৈনিক প্রান্তিক। 


















