ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, রাজস্ব কাঠামোকে জনবান্ধব করার পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) জনগণের কাছে ভয়ের নয়, বরং বিশ্বাস ও আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ২০২৩ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত এ সম্মেলনের উদ্দেশ্য এনবিআর ও রাজস্ব ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের ধারণা স্পষ্ট করা এবং রাজস্ব প্রশাসন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা কমানো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।’ জনগণ ও করদাতারা এনবিআরকে একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চান। দক্ষ ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ আস্থা অর্জন করতে হবে। করদাতাদের প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব এনবিআর কর্মকর্তাদেরই নিতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার রাজস্ব কাঠামোকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজ, হয়রানিমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অনলাইনে কর পরিশোধের সুযোগ সম্প্রসারিত হলে করদাতাদের সরকারি দপ্তরে আসার প্রয়োজন কমবে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে।
তিনি বলেন, একই করদাতার ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা টেকসই পদ্ধতি নয়। বরং কর প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের যথাযথভাবে করের আওতায় আনতে হবে। এ জন্য আধুনিক, ডিজিটাল ও তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও অর্থনীতির সক্ষমতার তুলনায় কম এবং করভিত্তিও তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ। অর্থনীতির বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকায় সীমিতসংখ্যক নিয়মিত করদাতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।
তিনি বলেন, আধুনিক কর প্রশাসনের লক্ষ্য শুধু বেশি কর আদায় নয়; বরং বেশি সংখ্যক মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করা। একজন করদাতা নিয়মিত কর দিলে রাষ্ট্র যেমন তাকে সম্মান করবে, তেমনি যারা ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকি দেন, তাদেরও আইনানুগভাবে কর প্রদানে উৎসাহিত করতে হবে।
ভ্যাট ব্যবস্থার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক অর্থনীতিতে ভ্যাট একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস। তবে ভ্যাট প্রশাসনের জটিলতার কারণে যেন ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও এনবিআরকে নজর দিতে হবে। কাস্টমস, ভ্যাট কিংবা আয়কর আদায়কে শুধু বলপ্রয়োগ বা এনফোর্সমেন্টের বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না; রাজস্ব প্রশাসনের সঙ্গে করদাতাদের আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।
তারেক রহমান আরও বলেন, রাজস্ব আহরণের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্র ও উৎস বাড়াতে হবে। বৈদেশিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব আয় বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের গণমুখী উৎপাদন নীতির ফলে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়ন বাড়বে, মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে—যা শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত করবে।
বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির বিকাশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন এবং নতুন নতুন ব্যবসায়িক মডেলের কারণে রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব কর্মকর্তাদের প্রচলিত কর আইন জানার পাশাপাশি অর্থনীতি, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
তিনি বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতি, ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, আন্তর্জাতিক কর ব্যবস্থা, বাণিজ্য অর্থায়ন, আর্থিক অপরাধ, অর্থপাচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্সের মতো বিষয়ে রাজস্ব কর্মকর্তাদের জ্ঞান থাকা জরুরি। পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বহুমাত্রিক দক্ষতা ছাড়া আধুনিক রাজস্ব প্রশাসন কার্যকর করা সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল করতে চায়। দেশে বিনিয়োগ বাড়লে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের প্রসার ঘটবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং মানুষের আয় বাড়বে। এর পাশাপাশি জনগণের জন্য উন্নত সরকারি সেবা নিশ্চিত করতেও কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
এনবিআরকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে মানুষ এটিকে ভয় না করে, বরং বিশ্বাস করে। করদাতার সঙ্গে রাজস্ব কর্মকর্তার আচরণ ও কার্যক্রমের মাধ্যমে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারলে রাজস্ব আহরণও সহজ হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে রাজস্ব আহরণের ইতিবাচক প্রবণতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা পারেন, আপনারাই পারেন এবং আপনারা অবশ্যই পারবেন, ইনশাআল্লাহ।’ দেশের স্বার্থে দেশপ্রেম, আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী, বিনিয়োগবান্ধব ও ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য সরকার, রাজস্ব প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও করদাতাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করতে হবে। তাঁর প্রত্যাশা, এনবিআর ভবিষ্যতে জনগণের আরও বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক-দৈনিক প্রান্তিক। 


















