জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করে হত্যা এবং একই ঘটনায় আরও দুজন নিহত হওয়ার মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ডের যে রায় দিয়েছিলেন, তার ১৪৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।
বুধবার তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারকরা রায়ে স্বাক্ষর করার পর এটি প্রকাশ করা হয়। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি শফিউল আলম ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম।
মামলার পটভূমি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। এরই মধ্যে রামপুরা এলাকার একটি বহুতল নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে প্রাণভয়ে ঝুলে থাকা এক তরুণকে লক্ষ্য করে গুলি করার দৃশ্য দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ওই তরুণসহ তিনজন নিহত হন।
পরবর্তীতে ঘটনাটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে তদন্ত শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের রায়
বিচারিক কার্যক্রম শেষে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সাক্ষ্য-প্রমাণে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আদালতের মতে, অভিযুক্তরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগে জড়িত ছিলেন, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল।
রায়ে সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে—
- মৃত্যুদণ্ড: ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান।
- যাবজ্জীবন কারাদণ্ড: রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।
- ২০ বছরের কারাদণ্ড: রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকার।
পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণ
১৪৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেন, আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর দায়িত্ব ছিল সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু অভিযুক্ত কর্মকর্তারা সেই দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে নিরস্ত্র বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগে ভূমিকা রাখেন। আদালতের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের আলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য।
আসামিদের বর্তমান অবস্থা
মামলার পাঁচ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে কেবল সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন। অন্য চারজন—সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম, সাবেক ওসি মশিউর রহমান এবং সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া—এখনও পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আপিলের সুযোগ
আইন অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর থেকে এক মাসের মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্তরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবেন। তবে পলাতক আসামিদের ক্ষেত্রে আপিলের আগে আদালতে আত্মসমর্পণ করা আইনি বাধ্যবাধকতা।
উল্লেখ্য, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে এটি প্রথম মৃত্যুদণ্ডের রায় নয়। এর আগে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত আরেকটি হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছিলেন।
বিশেষ প্রতিবেদক-দৈনিক প্রান্তিক। 



















