জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে আদালত তাকে ১ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন।
মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মঞ্জুরুল বাছিত ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মামলাটি দায়ের করা হয় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ছিল, ওই সময় দেশব্যাপী সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়নের ঘটনায় হাসানুল হক ইনুর ভূমিকা ছিল এবং তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণের মতো তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।
বিচার কার্যক্রমে গত বছরের ১ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। পরে ১০ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে ১০ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে এসে জবানবন্দি দেন। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ১৪ মে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, হাসানুল হক ইনু তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতা হিসেবে সরকারের নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় তৎকালীন সরকারের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল এবং আন্দোলন দমনের কৌশল নির্ধারণে তার ভূমিকা ছিল।
রাষ্ট্রপক্ষ আরও দাবি করে, আন্দোলনকারীদের একটি অংশকে ‘জঙ্গি’ হিসেবে চিহ্নিত করার কৌশল, কারফিউ জারি এবং আন্দোলন দমনের বিভিন্ন পরিকল্পনার সঙ্গে ইনুর সম্পৃক্ততার প্রমাণ তারা আদালতে উপস্থাপন করেছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন কথোপকথনের তথ্য, ভিডিও ও অন্যান্য নথি ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে যে, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে হাসানুল হক ইনু সাধারণ মানুষের আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং দমনমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যুক্তি তুলে ধরে।
অন্যদিকে ইনুর পক্ষে আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে তার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না এবং অভিযোগের সঙ্গে ইনুর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নেই।
এর আগে ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বিচার শুরুর আদেশ দেন। এরপর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।
হাসানুল হক ইনু বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। তিনি জাসদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে সংঘটিত সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে চলমান বিচারপ্রক্রিয়ায় তার বিরুদ্ধে দেওয়া এই রায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা 



















