Dhaka ০২:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউপি নির্বাচন দিয়েই শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার ভোট- থাকছে না অঙ্গীকারনামা

দীর্ঘ বিরতির পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকার ভোটের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হতে পারে। আগামী অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের জন্য বিদ্যমান অঙ্গীকারনামা জমা দেওয়ার বিধান বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিভিন্ন আইন, আচরণবিধি ও বিধিমালায় যুগোপযোগী পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব সংশোধনের লক্ষ্য হলো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও বাস্তবমুখী, সহজ ও কার্যকর করা। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই প্রার্থীদের অঙ্গীকারনামা জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে।

নির্বাচন কমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কমিশন সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত খসড়া সংশোধনী নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে কমিশনের বেশিরভাগ সদস্য মত দেন যে, অঙ্গীকারনামা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কার্যকর কোনো প্রভাব ফেলে না। বাস্তবে নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা যে প্রতিশ্রুতি দেন, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার মতো আইনি কাঠামোও দুর্বল। ফলে এ বিধান বহাল রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনের প্রস্তাব কমিশনে এসেছে। এর মধ্যে প্রার্থীদের অঙ্গীকারনামা জমা দেওয়ার বিধান বাদ দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা চাই নির্বাচনী বিধিমালা বাস্তবসম্মত ও প্রয়োগযোগ্য হোক। অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা কমিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।”

ইসি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারের প্রায় সব স্তরেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টির বেশি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং পার্বত্যাঞ্চল ছাড়া ৬১টি জেলা পরিষদ। অনেক জনপ্রতিনিধির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে অথবা শেষের পথে রয়েছে। ফলে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের ওপর চাপ বাড়ছে।

কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, কেন্দ্র পুনর্বিন্যাস, নির্বাচনী সরঞ্জাম প্রস্তুত এবং আইন সংশোধনের কাজ একযোগে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অক্টোবর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করে পর্যায়ক্রমে অন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভোট আয়োজনের চিন্তা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় আরও কিছু পরিবর্তনের বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে আচরণবিধি আরও কঠোর করা, নির্বাচনী ব্যয় নিরীক্ষা জোরদার করা এবং প্রচারণায় ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের বিষয়টি নতুনভাবে সংযোজনের আলোচনা রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন মাঠপর্যায়ে নিজেদের প্রস্তুতি যাচাইয়ের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচন পরিচালনায় প্রশাসনিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে অনিয়ম, সহিংসতা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ থাকায় এবার নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে জনমনে কৌতূহল রয়েছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনগুলোতে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য, কেন্দ্র দখল ও সংঘর্ষের অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে।

এদিকে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আগের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন, আচরণবিধি ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার সংশোধিত খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। কমিশনের অনুমোদনের পর তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং পরে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হতে পারে। সংশোধনী কার্যকর হলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নতুন বিধান অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

২৫ বছর কারাভোগের পর মুক্তি, দেড় মাসের মাথায় গুলিবিদ্ধ ‘কাইল্লা পলাশ’

ইউপি নির্বাচন দিয়েই শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার ভোট- থাকছে না অঙ্গীকারনামা

Update Time : ০৬:৫৪:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

দীর্ঘ বিরতির পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকার ভোটের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হতে পারে। আগামী অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের জন্য বিদ্যমান অঙ্গীকারনামা জমা দেওয়ার বিধান বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিভিন্ন আইন, আচরণবিধি ও বিধিমালায় যুগোপযোগী পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব সংশোধনের লক্ষ্য হলো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও বাস্তবমুখী, সহজ ও কার্যকর করা। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই প্রার্থীদের অঙ্গীকারনামা জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে।

নির্বাচন কমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কমিশন সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত খসড়া সংশোধনী নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে কমিশনের বেশিরভাগ সদস্য মত দেন যে, অঙ্গীকারনামা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কার্যকর কোনো প্রভাব ফেলে না। বাস্তবে নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা যে প্রতিশ্রুতি দেন, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার মতো আইনি কাঠামোও দুর্বল। ফলে এ বিধান বহাল রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনের প্রস্তাব কমিশনে এসেছে। এর মধ্যে প্রার্থীদের অঙ্গীকারনামা জমা দেওয়ার বিধান বাদ দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা চাই নির্বাচনী বিধিমালা বাস্তবসম্মত ও প্রয়োগযোগ্য হোক। অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা কমিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।”

ইসি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারের প্রায় সব স্তরেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টির বেশি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং পার্বত্যাঞ্চল ছাড়া ৬১টি জেলা পরিষদ। অনেক জনপ্রতিনিধির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে অথবা শেষের পথে রয়েছে। ফলে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের ওপর চাপ বাড়ছে।

কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, কেন্দ্র পুনর্বিন্যাস, নির্বাচনী সরঞ্জাম প্রস্তুত এবং আইন সংশোধনের কাজ একযোগে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অক্টোবর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করে পর্যায়ক্রমে অন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভোট আয়োজনের চিন্তা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় আরও কিছু পরিবর্তনের বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে আচরণবিধি আরও কঠোর করা, নির্বাচনী ব্যয় নিরীক্ষা জোরদার করা এবং প্রচারণায় ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের বিষয়টি নতুনভাবে সংযোজনের আলোচনা রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন মাঠপর্যায়ে নিজেদের প্রস্তুতি যাচাইয়ের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচন পরিচালনায় প্রশাসনিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে অনিয়ম, সহিংসতা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ থাকায় এবার নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে জনমনে কৌতূহল রয়েছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনগুলোতে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য, কেন্দ্র দখল ও সংঘর্ষের অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে।

এদিকে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আগের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন, আচরণবিধি ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার সংশোধিত খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। কমিশনের অনুমোদনের পর তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং পরে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হতে পারে। সংশোধনী কার্যকর হলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নতুন বিধান অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে।