দৈনিক প্রান্তিক’র একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও গভীর রহস্যে ঘেরা অধ্যায় ১৯৮১ সালের ৩০শে মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ঘটনাকে কেবলই একদল অসন্তুষ্ট সেনা কর্মকর্তার আকস্মিক বিদ্রোহ হিসেবে প্রচার করা হলেও, তৎকালীন সামরিক নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি এবং সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে এক সুদূরপ্রসারী ও সুপরিকল্পিত নীল-নকশার অকাট্য প্রমাণ মেলে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চিরায়ত সূত্র “Cui bono” (কার লাভ?) এবং ঘটনার পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট যে—এই হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড, প্রধান প্ররোচনাকারী এবং একমাত্র সুবিধাভোগী ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
প্রেক্ষাপট: জিয়া-মঞ্জুর ঐতিহাসিক সখ্যতা ও এরশাদের মনস্তাত্ত্বিক চাল
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর (এম এ মঞ্জুর)-এর সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের ও গভীর। তাঁরা উভয়েই পাকিস্তানের কাকুল সামরিক একাডেমি থেকে কমিশন প্রাপ্ত হন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে “বীর উত্তম” খেতাব পান।এই দুই বীর মুক্তিযোদ্ধার বিপরীতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে আটকা ছিলেন এবং স্বাধীনতার পর দেশে ফেরেন। ১৯৭৮ সালে প্রশাসনিক সমীকরণে জিয়াউর রহমান তুলনামূলক নিষ্ক্রিয় এরশাদকেই সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। ক্ষমতা হাতে পেয়েই এরশাদ অত্যন্ত সুকৌশলে জিয়া ও মঞ্জুরের গভীর সম্পর্কে ফাটল ধরানোর মনস্তাত্ত্বিক খেলা শুরু করেন।জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম পৌঁছানোর ঠিক আগ মুহূর্তে ঢাকা সেনা সদর থেকে একটি অপমানজনক আদেশ জারি করা হয়। যেখানে জেনারেল মঞ্জুরকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে ঢাকার ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের একটি নন-কমব্যাট্যান্ট পদে বদলি করা হয় এবং তাঁর চেয়ে ৩ বছরের জুনিয়র একজন অফিসারের অধীনে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ধূর্ত এরশাদ ইচ্ছা করেই মঞ্জুরকে চরম ক্ষুব্ধ করে তুলেছিলেন, যেন তিনি জিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
রক্তাক্ত সেই ভোর ও ঘাতক মতিনের ‘ক্লিনিং অপারেশন’
১৯৮১ সালের ৩০শে মে ভোররাত আনুমানিক ৪টার দিকে চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে আসা একদল সশস্ত্র সেনা সদস্য সার্কিট হাউসে হামলা চালায়। গুলির শব্দ শুনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন বারান্দায় আসেন, তখন তাঁকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করা হয়। ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন।এই কিলিং মিশনে মাঠপর্যায়ে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ৩ নম্বর বেঙ্গলের তৎকালীন অধিনায়ক মেজর মতিন। তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তাদের বিবরণী অনুযায়ী, মেজর মতিনকে ঢাকা থেকে বিশেষ প্ররোচনা ও উসকানি দিয়ে জিয়ার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জিয়া নিহত হওয়ার পর যখন বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়, তখন মেজর মতিনকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আটক এবং পরে সেনা হেফাজতে বা তথাকথিত ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়। সামরিক পরিভাষায় এটি ছিল একটি ক্লাসিক “ক্লিনিং অপারেশন” (Cleaning Operation)। ঘাতক মতিন বেঁচে থাকলে ঢাকা সেনা সদরের কোন শীর্ষ কর্মকর্তা তাঁকে এই অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছিলেন, তা ফাঁস হয়ে যেত। তাই প্রমাণের প্রথম সুতোটি সেখানেই কেটে দেওয়া হয়।
জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা: সত্য গোপনের মিশন
হত্যাকাণ্ডের পর জেনারেল মঞ্জুর সপরিবারে পালিয়ে যাওয়ার সময় ফটিকছড়ির হাটহাজারী থানা পুলিশ কর্তৃক অবরুদ্ধ ও গ্রেপ্তার হন। সাধারণ ফৌজদারি আইন অনুযায়ী তাঁকে আদালতে হাজির করার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল সদরউদ্দিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদের তীব্র চাপ ও প্ররোচনায় তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার পুলিশকে নির্দেশ দেন মঞ্জুরকে সেনাবাহিনীর কাছে সোপর্দ করতে।১লা জুন মধ্যরাতে হাটহাজারী থানা থেকে মঞ্জুরকে যখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে আসা হয়, তখন পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এরশাদের বিশ্বস্ত একটি বিশেষ স্কোয়াডের মাধ্যমে তাঁর মাথায় গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। জেনারেল মঞ্জুর মৃত্যুর আগে একাধিক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার কাছে টেলিফোনে দাবি করেছিলেন যে—ঢাকায় বসে এরশাদ এবং তাঁর সহযোগীরাই এই পুরো নাটকের মাস্টারমাইন্ড এবং মঞ্জুরকে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। মঞ্জুরকে আদালতে হাজির হতে দিলে জিয়া হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের আসল মুখটি উন্মোচিত হয়ে যেত, তাই প্রধান রাজসাক্ষীকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়।
প্রহসনের কোর্ট মার্শাল ও সেনাবাহিনী ‘মুক্তিযোদ্ধা-শূন্য’ করার কৌশলঃ
জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর সেনাপ্রধান এরশাদ মাত্র ১৮ দিনের এক প্রহসনের কোর্ট মার্শাল (সামরিক আদালত) গঠন করেন। এই আদালতের মূল উদ্দেশ্য জিয়া হত্যার প্রকৃত বিচার করা ছিল না, বরং সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা জিয়ার অনুগত এবং প্রথম সারির বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের সাফ করা।কোর্ট মার্শালের রায়ে ১৩ জন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাকে তড়িঘড়ি করে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং আরও বহু অফিসারকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এর ফলে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ “মুক্তিযোদ্ধা-শূন্য” ও এরশাদের অনুগত পাকিস্তান-প্রত্যাগত অফিসারদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রুহুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত বেসামরিক তদন্ত কমিশনকে কোনো সামরিক কর্মকর্তাকে তলব করার এখতিয়ার পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
চূড়ান্ত উদ্দেশ্য সাধন:
১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানজিয়া ও মঞ্জুরের মতো শক্তিশালী ব্যক্তিত্বরা যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন, এবং সেনাবাহিনীর ভেতরের প্রতিবাদী মুক্তিযোদ্ধা অংশটি যখন ফাঁসির দড়িতে ঝুলল, তখন এরশাদের সামনে ক্ষমতা দখলের আর কোনো বাধা রইল না। জিয়া হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১০ মাসের মাথায়, ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ, কোনো প্রতিরোধ বা এক ফোঁটা রক্তপাত ছাড়াই এরশাদ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে বন্দুকের মুখে হটিয়ে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন এবং দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসন কায়েম করেন।১৯৯৫ সালে সিআইডি কর্তৃক দায়েরকৃত “মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলা”-র মূল অভিযোগপত্রেও স্পষ্টাক্ষরে উল্লেখ করা হয় যে, তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদের সুপরিকল্পিত নকশা ও নির্দেশেই এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটানো হয়েছিল।
মামলার নথিপত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিস্ফোরক জবানবন্দি
মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যা মামলা (যা ১৯৯৫ সালে সিআইডি কর্তৃক দায়ের করা হয়) এবং তৎকালীন শীর্ষ সামরিক কর্তাদের লিখিত বিবরণী থেকে এরশাদের প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার অকাট্য আইনি তথ্য মেলে:
- এয়ার ভাইস মার্শাল সদরউদ্দিনের জবানবন্দি: তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধান তাঁর আনুষ্ঠানিক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, জিয়া নিহত হওয়ার পর ১লা জুন যখন জেনারেল মঞ্জুর হাটহাজারী থানায় আটক হন, তখন এরশাদ ঢাকা থেকে ছক সাজান। এরশাদের নির্দেশে ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম এবং ব্রিগেডিয়ার আবদুল লতিফ চট্টগ্রাম সেনানিবাসে একটি বিশেষ ঘাতক স্কোয়াড প্রস্তুত করেন।
- ক্যাপ্টেন এমদাদের মিশন: এরশাদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত অফিসার ক্যাপ্টেন এমদাদুল হককে হাটহাজারী থানা থেকে মঞ্জুরকে “ছিনিয়ে নেওয়ার” নাটক সাজানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। থানায় পুলিশ যখন মঞ্জুরকে সোপর্দ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল, তখন ঢাকা থেকে আইজিপি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরাসরি চাপ দিয়ে মঞ্জুরকে ক্যাপ্টেন এমদাদের জিপে তোলা হয়।
- ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের সেই রাত: জেনারেল এরশাদ পরবর্তীতে আদালতে দাবি করেছিলেন যে, উত্তেজিত জনতা মঞ্জুরকে হাসপাতাল নেওয়ার পথে হত্যা করেছে। কিন্তু সিআইডির তদন্তে এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা যায়, মঞ্জুরকে ঠান্ডা মাথায় চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ভেতরে পেছন থেকে মাথায় একটি মাত্র গুলি করে নিখুঁতভাবে হত্যা করা হয়েছিল, যা কেবল সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাদার ঘাতকের পক্ষেই সম্ভব।
ঐতিহাসিক তথ্য, সিআইডির চার্জশিট এবং প্রত্যক্ষদর্শী সামরিক প্রধানদের জবানবন্দি প্রমাণ করে যে, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের জিয়া হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন সেনা বিদ্রোহ ছিল না; এটি ছিল জেনারেল এরশাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। মাঠে থাকা ঘাতক মেজর মতিন এবং সাজানো অভ্যুত্থানের নেতা জেনারেল মঞ্জুরকে সেনা হেফাজতে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করার একমাত্র কারণ ছিল—ষড়যন্ত্রের মূল কেন্দ্রবিন্দু যেন ঢাকার সেনা সদরের দিকে না ছড়ায়। ঘাতক ও সাক্ষী উভয় পক্ষকেই চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এই সুচতুর ষড়যন্ত্রের-কৌশল প্রমাণ করে যে, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের মূল কুশীলব ও আসল মাস্টারমাইন্ড ছিলেন জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
তথ্যসূত্রঃ
“দুই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড: ১৯৮১-র ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান” — জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী (তৎকালীন ডিসি, চট্টগ্রাম)।
“বাংলাদেশ: রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমান” — মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.)।
সিআইডি কর্তৃক আদালতে দাখিলকৃত জবানবন্দি (মামলা নং- ২৪/১৯৯৫)।
দৈনিক প্রান্তিক’র একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন 













