দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট গড়ে তোলারও উদ্যোগ
প্রান্তিক প্রতিবেদক, গাজীপুরঃ
দেশের উত্তরাঞ্চলের পানি সংকট, কৃষি সেচব্যবস্থা ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় পদ্মা ব্যারাজের পাশাপাশি তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ (বুধবার) গাজীপুরের টঙ্গীর সাতাইশ ধরপাড়া এলাকায় জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে তিনি এ ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পদ্মা ব্যারাজ যেমন দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের পানিব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে, তেমনি তিস্তা ব্যারাজও উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জনজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। বিএনপি সরকার এ দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করবে।”
তিনি বলেন, তিস্তা নদী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হলেও বাস্তব আন্দোলন ও জনমত গঠনে বিএনপিই কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু-এর নেতৃত্বে তিস্তা ইস্যুতে বিএনপির ধারাবাহিক কর্মসূচির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
পানিসংকট, ফারাক্কা ও ব্যারাজের প্রয়োজনীয়তা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উজানে একের পর এক বাঁধ ও পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের নদীগুলো বিশেষ করে পদ্মা ও তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও নৌপথ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, “একসময় পদ্মা নদীর এপার থেকে ওপার দেখা যেত না। এখন অনেক জায়গায় নদী শুকিয়ে গেছে। পানির চাপ কমে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। সুন্দরবনের পরিবেশও হুমকির মুখে পড়ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা অববাহিকায় দীর্ঘদিনের পানিবণ্টন সংকটের কারণে রংপুর অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। প্রতিবছর বোরো মৌসুমে তিস্তার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষকদের গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে তিস্তা তীরবর্তী জেলাগুলোতে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন পূর্ববর্তী সমীক্ষায় তিস্তা অববাহিকায় পানি সংরক্ষণ, সেচ সম্প্রসারণ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে বৃহৎ ব্যারাজ বা সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আধুনিক জলাধার ও ব্যারাজ নির্মাণ হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে বহুমাত্রিক পরিবর্তন আসতে পারে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রায় আট একর জমির ওপর নির্মিতব্য এ প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ভবন, প্রশিক্ষণার্থীদের আবাসন, গবেষণাগার ও আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা থাকবে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি কর্মকর্তা, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এই ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় গবেষণাকেন্দ্র হিসেবেও এটি কাজ করবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দৃশ্যমান। নদী শুকিয়ে যাওয়া, জলাশয় ভরাট হওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত বৃক্ষনিধনের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এলাকায় সড়ক নির্মাণে বিপুল গাছ কাটার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণের সময় পরিবেশ রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, “উন্নয়ন করতে হবে, কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস করে নয়। একটি গাছও যেন অপ্রয়োজনে কাটা না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।”
‘দুর্যোগ থামানো না গেলেও ক্ষতি কমানো সম্ভব’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে সচেতনতা, প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়।
তিনি বলেন, “আমাদের সম্পদ সীমিত। তাই মানুষ ও সম্পদ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। দুর্যোগের সময় কীভাবে নিজেকে, পরিবারকে ও দেশের সম্পদকে রক্ষা করা যায়, সেই প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে।”
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন, মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজানুর রহমান, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত সরকারসহ ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রান্তিক প্রতিবেদন 


















