Dhaka ১১:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভূমিসেবায় দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধে সরকারের নতুন অঙ্গীকার

প্রান্তিক প্রতিবেদনঃ

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবনে মঙ্গলবার শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’ শুধু একটি প্রশাসনিক আয়োজন নয়; বরং দেশের দীর্ঘদিনের জটিল, দুর্নীতিপ্রবণ ও জনভোগান্তিময় ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব রূপ দেওয়ার একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ভূমিসেবায় দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধ করতে চায় সরকার এবং প্রতিটি সেবাখাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমছে। ফলে জমির আর্থিক মূল্য যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা, জালিয়াতি ও সামাজিক দ্বন্দ্ব। বহু ক্ষেত্রে জমি সংক্রান্ত বিরোধ পরিবার ও সমাজের শান্তি বিনষ্ট করছে, এমনকি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও বাধা সৃষ্টি করছে। তাই ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার, নির্ভুল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

মঙ্গলবার বেলা ১১টা ১৯ মিনিটে ভূমি ভবনে বাটন চাপার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার উদ্বোধন করেন। একইসঙ্গে দেশের সব জেলা ও উপজেলায় একযোগে শুরু হয় এই মেলা, যা চলবে আগামী ২১ মে পর্যন্ত। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—“জনবান্ধব অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ ভূমি এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ”।

সরকারপ্রধান বলেন, ভূমি প্রশাসনের প্রায় সব সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষকে দালাল, ঘুষ কিংবা অপ্রয়োজনীয় হয়রানির মুখোমুখি হতে না হয়। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবেই ভূমি ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে ভূমি খাত ঐতিহাসিকভাবেই দুর্নীতি, রেকর্ড জটিলতা ও প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। খতিয়ান সংশোধন, নামজারি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ কিংবা মৌজা ম্যাপ সংগ্রহ—এসব সাধারণ সেবা পেতেও নাগরিকদের বছরের পর বছর ঘুরতে হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও নাগরিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ভূমি অফিসে দালালচক্র, কাগুজে জটিলতা ও অনিয়ম বহু মানুষের জন্য ন্যায়বিচার ও সম্পত্তির নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এ বাস্তবতায় সরকারের নতুন ডিজিটাল উদ্যোগকে প্রশাসনিক সংস্কারের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, মেলায় নাগরিকরা সরাসরি জানতে পারবেন ভূমি পোর্টালে নিবন্ধন, ই-নামজারি আবেদন, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, খতিয়ান ও ডি.সি.আর সংগ্রহ, মৌজা ম্যাপ প্রাপ্তিসহ বিভিন্ন সেবার বিস্তারিত প্রক্রিয়া। কিছু সেবা তাৎক্ষণিকভাবেও প্রদান করা হচ্ছে।

মেলায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে ই-নামজারি ব্যবস্থা। আগে নামজারি করতে সাধারণ মানুষকে ইউনিয়ন ভূমি অফিস, এসি ল্যান্ড অফিস এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। এখন অনলাইন আবেদন ও ডিজিটাল যাচাইয়ের মাধ্যমে সেই সময় কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। একইসঙ্গে অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের সুযোগ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাতীয় হটলাইন ১৬১২২ এবং বিভাগীয় হটলাইন ০১৭০৬৮৮৮৭৮৭ এর মাধ্যমে ভূমিসেবা সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকার ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে। মেলায় এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি “ভূমি আমার ঠিকানা” শীর্ষক তথ্যবহুল বুকলেট সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে, যাতে সহজ ভাষায় ভূমিসেবা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও বলেন, উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে নির্ভুল ভূমি রেকর্ড প্রস্তুতের কাজ চলছে। ভূমি মন্ত্রণালয় ভবিষ্যতে ল্যান্ড জোনিং, ডিজিটাল জরিপ এবং জমি ক্রয়ের সঙ্গে সঙ্গে মালিকানা সনদ প্রদানের পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে। এছাড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও উপজেলা ভূমি অফিসের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে একীভূত ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ও ই-নামজারি কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবিতে স্কুলছাত্র অপহরণ, রাতভর অভিযানে উদ্ধার; গ্রেপ্তার ৫

ভূমিসেবায় দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধে সরকারের নতুন অঙ্গীকার

Update Time : ০৮:৫৬:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

প্রান্তিক প্রতিবেদনঃ

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবনে মঙ্গলবার শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’ শুধু একটি প্রশাসনিক আয়োজন নয়; বরং দেশের দীর্ঘদিনের জটিল, দুর্নীতিপ্রবণ ও জনভোগান্তিময় ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব রূপ দেওয়ার একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ভূমিসেবায় দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধ করতে চায় সরকার এবং প্রতিটি সেবাখাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমছে। ফলে জমির আর্থিক মূল্য যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা, জালিয়াতি ও সামাজিক দ্বন্দ্ব। বহু ক্ষেত্রে জমি সংক্রান্ত বিরোধ পরিবার ও সমাজের শান্তি বিনষ্ট করছে, এমনকি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও বাধা সৃষ্টি করছে। তাই ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার, নির্ভুল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

মঙ্গলবার বেলা ১১টা ১৯ মিনিটে ভূমি ভবনে বাটন চাপার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার উদ্বোধন করেন। একইসঙ্গে দেশের সব জেলা ও উপজেলায় একযোগে শুরু হয় এই মেলা, যা চলবে আগামী ২১ মে পর্যন্ত। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—“জনবান্ধব অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ ভূমি এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ”।

সরকারপ্রধান বলেন, ভূমি প্রশাসনের প্রায় সব সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষকে দালাল, ঘুষ কিংবা অপ্রয়োজনীয় হয়রানির মুখোমুখি হতে না হয়। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবেই ভূমি ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে ভূমি খাত ঐতিহাসিকভাবেই দুর্নীতি, রেকর্ড জটিলতা ও প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। খতিয়ান সংশোধন, নামজারি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ কিংবা মৌজা ম্যাপ সংগ্রহ—এসব সাধারণ সেবা পেতেও নাগরিকদের বছরের পর বছর ঘুরতে হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও নাগরিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ভূমি অফিসে দালালচক্র, কাগুজে জটিলতা ও অনিয়ম বহু মানুষের জন্য ন্যায়বিচার ও সম্পত্তির নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এ বাস্তবতায় সরকারের নতুন ডিজিটাল উদ্যোগকে প্রশাসনিক সংস্কারের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, মেলায় নাগরিকরা সরাসরি জানতে পারবেন ভূমি পোর্টালে নিবন্ধন, ই-নামজারি আবেদন, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, খতিয়ান ও ডি.সি.আর সংগ্রহ, মৌজা ম্যাপ প্রাপ্তিসহ বিভিন্ন সেবার বিস্তারিত প্রক্রিয়া। কিছু সেবা তাৎক্ষণিকভাবেও প্রদান করা হচ্ছে।

মেলায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে ই-নামজারি ব্যবস্থা। আগে নামজারি করতে সাধারণ মানুষকে ইউনিয়ন ভূমি অফিস, এসি ল্যান্ড অফিস এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। এখন অনলাইন আবেদন ও ডিজিটাল যাচাইয়ের মাধ্যমে সেই সময় কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। একইসঙ্গে অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের সুযোগ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাতীয় হটলাইন ১৬১২২ এবং বিভাগীয় হটলাইন ০১৭০৬৮৮৮৭৮৭ এর মাধ্যমে ভূমিসেবা সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকার ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে। মেলায় এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি “ভূমি আমার ঠিকানা” শীর্ষক তথ্যবহুল বুকলেট সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে, যাতে সহজ ভাষায় ভূমিসেবা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও বলেন, উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে নির্ভুল ভূমি রেকর্ড প্রস্তুতের কাজ চলছে। ভূমি মন্ত্রণালয় ভবিষ্যতে ল্যান্ড জোনিং, ডিজিটাল জরিপ এবং জমি ক্রয়ের সঙ্গে সঙ্গে মালিকানা সনদ প্রদানের পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে। এছাড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও উপজেলা ভূমি অফিসের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে একীভূত ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ও ই-নামজারি কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।