পাঁচ পুলিশ সদস্য সাময়িক বরখাস্ত, তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি
প্রান্তিক প্রতিবেদন, গাজীপুর
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকার আদালতে হাজিরা শেষে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফেরার পথে পুলিশ পাহারায় থাকা প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে গেছেন রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদকচক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে পুলিশের নথিতে পরিচিত এই আসামির বিরুদ্ধে অন্তত ২৫টি মামলার তথ্য রয়েছে। ঘটনার পর দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার কারণ ও দায়িত্বে কারও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ।
টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে নামানো হয়
পুলিশ ও কারা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকালে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ৩০ জন আসামিকে বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নিতে ঢাকার আদালতে নেওয়া হয়। আদালতের কার্যক্রম শেষে বিকেলে তাঁদের প্রিজন ভ্যানে করে কাশিমপুর কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রিজন ভ্যানটি গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে পৌঁছালে রাজা ওরফে পিচ্চি রাজা টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পরে দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ সদস্য তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে শৌচাগারে নেওয়ার সময় তিনি সুযোগ বুঝে দৌড়ে পালিয়ে যান। ভ্যানে থাকা অন্য ২৯ আসামিকে পরে নিরাপদে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়া হয়।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে তাঁরা জানতে পেরেছেন—টয়লেট ব্যবহারের জন্য ওই বন্দিকে গাড়ি থেকে নামানো হয়েছিল এবং তখনই তিনি পালিয়ে যান। কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল এবং কারও গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পাঁচ পুলিশ সদস্য সাময়িক বরখাস্ত
পিচ্চি রাজার পলায়নের পর গাজীপুর মহানগর পুলিশ দায়িত্বে থাকা পাঁচ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।
জিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান জানান, বরখাস্ত হওয়া পাঁচজনের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা এবং প্রিজন ভ্যানের চালকও রয়েছেন। এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, ডিসি হেডকোয়ার্টারের নেতৃত্বে কমিটিটি কাজ করবে। তদন্তের মাধ্যমে পিচ্চি রাজা কীভাবে নিরাপত্তা বলয় থেকে বেরিয়ে গেলেন এবং দায়িত্বে থাকা সদস্যদের ভূমিকা কী ছিল—তা নির্ধারণ করা হবে।
বিস্ফোরক মামলার আসামি
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এর কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পিচ্চি রাজা একটি বিস্ফোরক আইনের মামলায় বন্দি ছিলেন। আদালতে হাজিরা শেষে তাঁকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল।
তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা নিয়ে সামান্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। গাজীপুর পুলিশের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তাঁর বিরুদ্ধে ২৫টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে; অন্য একটি প্রতিবেদনে ডিএমপির কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ২৯টি মামলা, যার মধ্যে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মাদক ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত মামলা রয়েছে, বলা হয়েছে। তাই মামলার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সংশ্লিষ্ট মামলার নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
মে মাসে নেপাল থেকে ফেরার পর গ্রেপ্তার
পিচ্চি রাজাকে চলতি বছরের ১৯ মে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনি স্ত্রী ও শ্যালককে নিয়ে নেপাল থেকে দেশে ফেরার পর ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় তাঁকে হেফাজতে নেওয়া হয়। সে সময় পুলিশ তাঁকে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক কারবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে থাকা ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
মে মাসে গ্রেপ্তারের সময় ডিএমপির এক কর্মকর্তা তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মাদক ও বিস্ফোরকসহ ২৯টি মামলার কথা জানিয়েছিলেন।
২০২৪ সালেও গ্রেপ্তার
এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে র্যাব-২ ও যৌথ বাহিনীর অভিযানে পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সেই অভিযানে পিচ্চি রাজাসহ ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। অভিযানে দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি দুটি পিস্তল, ২০ রাউন্ড গুলি এবং মাদক উদ্ধারের কথাও জানানো হয়েছিল।
জেনেভা ক্যাম্পের সংঘাতের প্রেক্ষাপট
পুলিশের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পিচ্চি রাজাকে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক একটি মাদকচক্রের হোতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই এলাকায় একাধিক মাদকচক্রের বিরোধ ও সংঘাতের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এসব ক্ষেত্রে পুলিশের অভিযোগ ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
এখন মূল প্রশ্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে
একজন বহু মামলার আসামি, যিনি বিস্ফোরক আইনের মামলায় কারাগারে ছিলেন, তাঁকে আদালত থেকে কারাগারে ফেরানোর পথে প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে শৌচাগারে নেওয়ার সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো—ঘটনার তদন্তে এখন এই প্রশ্নটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন থেকে বোঝা যাচ্ছে, কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে নিরাপত্তাজনিত গুরুতর বিষয় হিসেবে নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোন পর্যায়ে কী ধরনের ব্যর্থতা ঘটেছিল কিংবা পলায়নের পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এদিকে পিচ্চি রাজাকে পুনরায় গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাঁর পলায়নের ঘটনাটি শুধু একজন আসামির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; পুলিশ পাহারায় আদালত থেকে কারাগারে বন্দি পরিবহনের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রান্তিক প্রতিবেদন, গাজীপুর। 











