Dhaka ০৯:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে উত্তাল গাজীপুর

নিজস্ব প্রতিবেদক -দৈনক প্রান্তিক।| গাজীপুর | ১ নভেম্বর ২০২৬

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে টানা আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশের প্রধান তৈরি পোশাকশিল্পাঞ্চল গাজীপুর। শ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং কারখানা বন্ধের ঘটনায় শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাঁচ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের দাবি বিবেচনায় নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। রোববার (১ নভেম্বর) মন্ত্রণালয় থেকে বোর্ড গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনও জারি হয়েছে। তবে নতুন মজুরি কত হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।

রোববার সকাল থেকেই গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর বাজার, মৌচাক ও টেলিহাটি এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল পথে চলাচলকারী যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন আটকা পড়ে।

কারখানায় হাজিরা দেওয়ার পরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকেরা কর্মস্থল ত্যাগ করে আন্দোলনে যোগ দেন। কালিয়াকৈরের রতনপুর এলাকার কোরানী নিট কম্পোজিট ও নিট এশিয়াসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতির অবনতিতে আশপাশের কয়েকটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

এর আগে শনিবার (৩১ অক্টোবর) চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ ও আনসার একাডেমির ৩ নম্বর ফটকসংলগ্ন এলাকায় শ্রমিকেরা মহাসড়ক অবরোধ করেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত অবরোধ চলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

রোববার সকালে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কোনাবাড়ী এলাকায় একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পুলিশ জানায়, বিক্ষোভকারীরা পুলিশ বক্সের সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালামাল বের করে আগুন ধরিয়ে দেন।

আন্দোলন ঘিরে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে। কোথাও কোথাও শ্রমিকদের ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। শনিবারের সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় অন্তত ১৫টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া। চন্দ্রা ও পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, কোনাবাড়ী, মৌচাক, নাওজোড় ও ভোগড়া বাইপাসসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন হলে বিজিবির সংখ্যা বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে প্রশাসন।

শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে কারখানা বন্ধ ঘোষণা এবং শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। একাধিক প্রতিবেদনে শনিবার গাজীপুর ও আশুলিয়া মিলিয়ে প্রায় ৫০টি কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য এসেছে। তবে রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে চন্দ্রা ও কালিয়াকৈরের কারখানাগুলো খুলে শ্রমিকদের কাজে ফেরার কথা জানানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নতুন করে অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনায় পরিস্থিতির আবার অবনতি ঘটে। ফলে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতি একরকম ছিল না।

শ্রমিকদের আন্দোলনের মূল দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। তাঁদের বক্তব্য, বর্তমান বাজারদরে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের ব্যয় মেটাতে প্রচলিত মজুরি যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে গাজীপুরের মতো শিল্পাঞ্চলে বাড়িভাড়া, খাবার ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে তৈরি পোশাকশিল্পে নির্ধারিত সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের মজুরি পুনর্নির্ধারণের পর এই হার কার্যকর হয়। শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবি বাস্তবায়িত হলে বর্তমান সর্বনিম্ন মজুরির তুলনায় তা হবে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা বেশি। অর্থাৎ বর্তমান মজুরির প্রায় ২ দশমিক ৪ গুণ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৩০ হাজার টাকা শুধু একটি সংখ্যাগত দাবি নয়; এটি শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও বিদ্যমান মজুরি কাঠামোর মধ্যে তৈরি হওয়া ব্যবধানের প্রতিফলন। শ্রমিকদের দাবি বিবেচনায় নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আবাসন ব্যয়, পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং চিকিৎসা ব্যয়কে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

অন্যদিকে পোশাকশিল্পের মালিকদেরও উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, ক্রেতাদের মূল্য নির্ধারণ, জ্বালানি সংকট ও রপ্তানি আদেশের অনিশ্চয়তার মতো বিষয় মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি শ্রমিকদের জীবনমানের পাশাপাশি শিল্পের সক্ষমতা ও রপ্তানি প্রতিযোগিতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তের কথা জানান শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। শনিবার শ্রম ভবনে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি জানান, ১ নভেম্বর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হবে।

মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টার আলোচনা এবং মালিকপক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ এবং প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

রোববার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আয়ুবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে মনোনীত করা হয়েছে। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আইন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৮ ধারা এবং ২০২৬ সালের সংশোধিত বিধান অনুযায়ী বোর্ড গঠনের এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তবে বোর্ড গঠন মানেই ৩০ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণ নয়। এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় পর্যালোচনা করে নতুন মজুরি সুপারিশের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবির পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বকেয়া বেতন, শ্রমিক ছাঁটাই এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগও সামনে এসেছে। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে আন্দোলনরত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে। ফলে চলমান অসন্তোষকে কেবল মজুরি বৃদ্ধির একক দাবিতে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই।

শ্রমিকদের বেতন সময়মতো পরিশোধ না হওয়া, কর্মস্থলে অনিশ্চয়তা এবং চাকরি হারানোর আশঙ্কা দীর্ঘদিনের অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। অন্যদিকে মালিকপক্ষের বক্তব্য, কারখানা বন্ধ ও উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়। এতে রপ্তানি আয় ও কারখানার আর্থিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও বেতন পরিশোধেও পড়তে পারে।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের বৈঠকেও বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লে শুধু স্থানীয় উৎপাদন নয়, জাতীয় সরবরাহব্যবস্থাও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে আর্থিক ক্ষতি ও ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে শ্রমিকদের দাবি ও শিল্পের স্বার্থকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার পরিবর্তে ন্যায্য মজুরি, নিয়মিত বেতন পরিশোধ এবং উৎপাদনশীল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে রাখা প্রয়োজন।

রোববার দুপুর পর্যন্ত গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

গাজীপুরে শ্রমিক অবরোধে আওয়ামী ছায়া; আবারও বন্ধ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে উত্তাল গাজীপুর

Update Time : ০৮:১৬:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক -দৈনক প্রান্তিক।| গাজীপুর | ১ নভেম্বর ২০২৬

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে টানা আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশের প্রধান তৈরি পোশাকশিল্পাঞ্চল গাজীপুর। শ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং কারখানা বন্ধের ঘটনায় শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাঁচ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের দাবি বিবেচনায় নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। রোববার (১ নভেম্বর) মন্ত্রণালয় থেকে বোর্ড গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনও জারি হয়েছে। তবে নতুন মজুরি কত হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।

রোববার সকাল থেকেই গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর বাজার, মৌচাক ও টেলিহাটি এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল পথে চলাচলকারী যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন আটকা পড়ে।

কারখানায় হাজিরা দেওয়ার পরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকেরা কর্মস্থল ত্যাগ করে আন্দোলনে যোগ দেন। কালিয়াকৈরের রতনপুর এলাকার কোরানী নিট কম্পোজিট ও নিট এশিয়াসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতির অবনতিতে আশপাশের কয়েকটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

এর আগে শনিবার (৩১ অক্টোবর) চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ ও আনসার একাডেমির ৩ নম্বর ফটকসংলগ্ন এলাকায় শ্রমিকেরা মহাসড়ক অবরোধ করেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত অবরোধ চলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

রোববার সকালে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কোনাবাড়ী এলাকায় একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পুলিশ জানায়, বিক্ষোভকারীরা পুলিশ বক্সের সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালামাল বের করে আগুন ধরিয়ে দেন।

আন্দোলন ঘিরে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে। কোথাও কোথাও শ্রমিকদের ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। শনিবারের সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় অন্তত ১৫টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া। চন্দ্রা ও পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, কোনাবাড়ী, মৌচাক, নাওজোড় ও ভোগড়া বাইপাসসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন হলে বিজিবির সংখ্যা বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে প্রশাসন।

শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে কারখানা বন্ধ ঘোষণা এবং শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। একাধিক প্রতিবেদনে শনিবার গাজীপুর ও আশুলিয়া মিলিয়ে প্রায় ৫০টি কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য এসেছে। তবে রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে চন্দ্রা ও কালিয়াকৈরের কারখানাগুলো খুলে শ্রমিকদের কাজে ফেরার কথা জানানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নতুন করে অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনায় পরিস্থিতির আবার অবনতি ঘটে। ফলে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতি একরকম ছিল না।

শ্রমিকদের আন্দোলনের মূল দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। তাঁদের বক্তব্য, বর্তমান বাজারদরে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের ব্যয় মেটাতে প্রচলিত মজুরি যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে গাজীপুরের মতো শিল্পাঞ্চলে বাড়িভাড়া, খাবার ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে তৈরি পোশাকশিল্পে নির্ধারিত সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের মজুরি পুনর্নির্ধারণের পর এই হার কার্যকর হয়। শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবি বাস্তবায়িত হলে বর্তমান সর্বনিম্ন মজুরির তুলনায় তা হবে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা বেশি। অর্থাৎ বর্তমান মজুরির প্রায় ২ দশমিক ৪ গুণ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৩০ হাজার টাকা শুধু একটি সংখ্যাগত দাবি নয়; এটি শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও বিদ্যমান মজুরি কাঠামোর মধ্যে তৈরি হওয়া ব্যবধানের প্রতিফলন। শ্রমিকদের দাবি বিবেচনায় নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আবাসন ব্যয়, পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং চিকিৎসা ব্যয়কে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

অন্যদিকে পোশাকশিল্পের মালিকদেরও উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, ক্রেতাদের মূল্য নির্ধারণ, জ্বালানি সংকট ও রপ্তানি আদেশের অনিশ্চয়তার মতো বিষয় মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি শ্রমিকদের জীবনমানের পাশাপাশি শিল্পের সক্ষমতা ও রপ্তানি প্রতিযোগিতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তের কথা জানান শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। শনিবার শ্রম ভবনে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি জানান, ১ নভেম্বর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হবে।

মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টার আলোচনা এবং মালিকপক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ এবং প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

রোববার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আয়ুবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে মনোনীত করা হয়েছে। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আইন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৮ ধারা এবং ২০২৬ সালের সংশোধিত বিধান অনুযায়ী বোর্ড গঠনের এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তবে বোর্ড গঠন মানেই ৩০ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণ নয়। এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় পর্যালোচনা করে নতুন মজুরি সুপারিশের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবির পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বকেয়া বেতন, শ্রমিক ছাঁটাই এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগও সামনে এসেছে। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে আন্দোলনরত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে। ফলে চলমান অসন্তোষকে কেবল মজুরি বৃদ্ধির একক দাবিতে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই।

শ্রমিকদের বেতন সময়মতো পরিশোধ না হওয়া, কর্মস্থলে অনিশ্চয়তা এবং চাকরি হারানোর আশঙ্কা দীর্ঘদিনের অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। অন্যদিকে মালিকপক্ষের বক্তব্য, কারখানা বন্ধ ও উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়। এতে রপ্তানি আয় ও কারখানার আর্থিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও বেতন পরিশোধেও পড়তে পারে।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের বৈঠকেও বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লে শুধু স্থানীয় উৎপাদন নয়, জাতীয় সরবরাহব্যবস্থাও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে আর্থিক ক্ষতি ও ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে শ্রমিকদের দাবি ও শিল্পের স্বার্থকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার পরিবর্তে ন্যায্য মজুরি, নিয়মিত বেতন পরিশোধ এবং উৎপাদনশীল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে রাখা প্রয়োজন।

রোববার দুপুর পর্যন্ত গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।