মিরপুরে নাশকতার অভিযোগে ১১ জন গ্রেপ্তার, আরও ১৭ জন আটক; শ্রমিক লীগ, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ
মোঃ আলফাজ উদ্দিন-সম্পাদক,দৈনিক প্রান্তিক| ১ নভেম্বর ২০২৬
পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে চলমান আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে। রাজধানীর মিরপুরে শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ১১ জন গ্রেপ্তার এবং মিরপুর বিভাগের পুলিশের হাতে আরও ১৭ জন আটক হয়েছেন। সব মিলিয়ে আটকের সংখ্যা ২৮।
পুলিশের দাবি, শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মাসিক মজুরির দাবিকে সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে সহিংস পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঢাকায় এনে আন্দোলনস্থলে জড়ো করারও অভিযোগ রয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) ডিবি মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান প্রথম পর্যায়ে ১১ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার রাজনৈতিক সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী।
গ্রেপ্তার ১১ জনের মধ্যে শ্রমিক লীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে মো. কামাল গাজীর নাম এসেছে। তাঁকে শ্রমিক লীগের সহসাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওলিউল্লাহ অনিক, আলিফ হোসেন ইমন, নাহিদ হাসান, আরিফ আকন্দ, জায়েদ করিম রিয়াজ, মোয়াজ্জেম শাহরিয়া নিয়াজ, জুবায়েদ ইসলাম জিসান, মাহিম মোল্লা ও রমজান সরকারের নামও প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য এবং কয়েকজনকে যুবলীগের নেতাকর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিবির দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও সহিংসতার ঘটনায় ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আলিফ মোল্লাকে সমন্বয়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে ডিবি
এ ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লার নামও আলোচনায় এসেছে। ডিবির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খানের দাবি, আলিফ মোল্লা বিভিন্ন জেলা থেকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঢাকায় এনে আন্দোলনস্থলে জড়ো করার সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছেন।
ডিবির দাবি অনুযায়ী, বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নেতাকর্মীদের একটি অংশ আন্দোলনস্থলে অবস্থান নিয়েছিল। তাঁদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে। তবে আলিফ মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্যও প্রকাশিত হয়নি।
ছাত্রলীগ নেতার আন্দোলনে অংশগ্রহণ
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও সামনে এসেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজবুল ইসলাম রোববার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শ্রমিক আন্দোলনের একাধিক ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন।
ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রতিবেদনে তাঁর আন্দোলনে অংশগ্রহণের ছবি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সাজবুল ইসলামকে আটক করা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বিরুদ্ধে নাশকতায় অংশগ্রহণের অভিযোগও পুলিশের প্রকাশিত গ্রেপ্তার তালিকায় নেই।
মিরপুরে সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে আগুন
রোববার সকালে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরসহ আশপাশের এলাকায় পোশাকশ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে আন্দোলন মিরপুর-১১, মিরপুর-১২ ও পল্লবী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, দুপুরের দিকে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পূরবী সিনেমা হলের সামনে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
পরিস্থিতির কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। এতে সাধারণ যাত্রী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের চলাচলে ব্যাপক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।
আরও ১৭ জন আটক, পরিচয় প্রকাশ করেনি পুলিশ
ডিবি মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান প্রথম পর্যায়ে ১১ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানান। পরে মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার আবু নাসের রিকাবদার আরও ১৭ জনকে আটকের তথ্য নিশ্চিত করেন।
পুলিশের দাবি, আটক ব্যক্তিরা সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের হয়ে মিছিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ে আটক ১৭ জনের নাম ও সাংগঠনিক পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
শ্রমিকদের মূল দাবি ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি
রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে পোশাকশ্রমিকদের মূল দাবি মজুরি বৃদ্ধি। শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান আয় দিয়ে বাড়িভাড়া, খাদ্য, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছেন।
এদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী রোববার পোশাকশ্রমিকদের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী শ্রমিকদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে।
মিরপুরের পাশাপাশি গাজীপুর ও আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং কারখানায় ছুটি ঘোষণার ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পোশাকশিল্পাঞ্চলগুলোতে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন-সম্পাদক,দৈনিক প্রান্তিক| ১ নভেম্বর ২০২৬ 









