বাসে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ ও রেলপথ ঘিরে বাড়ছে নজরদারি
প্রান্তিক অনুসন্ধান | ঢাকা | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে অগ্নিসংযোগ এবং রেলপথে নাশকতার ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের তদন্ত ও সাম্প্রতিক কয়েকটি মামলার তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার একাধিক ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, নাশকতার একটি অংশে ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে—অর্থাৎ আকস্মিকভাবে হামলা বা অগ্নিসংযোগ করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করা। বিশেষ করে রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের এলাকাগুলোকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তিন দিনে ৩২ ককটেল, ছয় বাসে আগুন
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে ঘন চিত্র দেখা যায় ১৯ থেকে ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। পুলিশের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই তিন দিনে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৩২টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে কাফরুল থানার সামনে, মিরপুর-১১, মিরপুর-১, মধ্য বাড্ডা, পল্লবী ও আজিমপুরে ছয়টি বাসে অগ্নিসংযোগ বা অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা হয়।
ঘটনাগুলোর মধ্যে মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট, বাবুবাজার, কমলাপুর, মগবাজার, মৎস্য ভবন, শিল্পকলা একাডেমি, সুপ্রিম কোর্ট এলাকা ও রামপুরার বিটিভি ভবনের সামনের ঘটনাগুলোও রয়েছে বলে পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পল্লবীর বাসে আগুন: ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় পল্লবীর মিরপুর-১১ প্রধান সড়কে ইস্টার্ন ব্যাংকের সামনে ‘শিকড় পরিবহন’-এর একটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পল্লবী থানা সভাপতি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭০ থেকে ৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে ঘটনাটিকে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নাশকতা ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তিকে আদালত কারাগারে পাঠিয়েছেন।
সিদ্ধিরগঞ্জেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা
রাজধানীর বাইরে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে পার্কিং করে রাখা ‘নীলাচল’ পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১৮ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাত আরও ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বাসটির মালিক মো. আল-আমিনের দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, গভীর রাতে পার্কিংয়ে থাকা বাসটিতে সংঘবদ্ধভাবে আগুন দেওয়া হয়। এতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
কমলাপুরে ককটেল, রেলপথেও আগুন
বাসে অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি রেল যোগাযোগ ঘিরেও একাধিক ঘটনা তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
১৯ সেপ্টেম্বর রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। রেলওয়ে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজন বাংলাদেশ রেলওয়ের কমলাপুর স্টেশনের এমওডি শাখায় ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের শাহজাহানপুর থানা শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। অপরজনকে শাহজাহানপুর এলাকার যুবলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে বলে রেলওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ট্রেনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাতেও মামলা হয়েছে।
যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক নেতাসহ চারজনকে রিমান্ডে নেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
‘নিজেদের বাসে আগুন’—তদন্তে কী উঠে এসেছে?
সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে সবচেয়ে আলোচিত দাবি হলো—অগ্নিসংযোগ করা বাসগুলোর একটি অংশের মালিকানা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা দলটির সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যুক্ত।
কয়েকটি সংবাদমাধ্যম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তসূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছে, কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের মালিকানাধীন বাসে আগুন দেওয়ার মাধ্যমে একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা থাকতে পারে। এই অভিযোগের একটি অংশ হলো—বাস পুড়িয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, সরকারের ওপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ চাপানো এবং পরবর্তী সময়ে বিমা কোম্পানির কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করা।
‘হিট অ্যান্ড রান’ কেন নজরে?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের কয়েকটি এলাকাকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। পূর্ব দিকে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ, বাসাবো ও খিলগাঁও এবং পশ্চিম দিকে গাবতলী, মোহাম্মদপুর, বসিলা ও মিরপুরের প্রান্তিক এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত নজরদারি, চেকপোস্ট ও প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
পুলিশের যুক্তি, এসব এলাকার একটি বৈশিষ্ট্য হলো—রাজধানীর কেন্দ্র থেকে দ্রুত বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ এবং ঘনবসতির কারণে হামলাকারীদের সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা। ডিবির পক্ষ থেকেও ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তকে নাশকতার ক্ষেত্রে বিশেষ নজরে রাখার কথা বলা হয়েছে।
চার বাহিনীর সমন্বিত নজরদারি
পরিকল্পিত নাশকতার আশঙ্কায় রাজধানীতে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন, ডিএমপি, ডিবি ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম—সিটিটিসির সমন্বিত তৎপরতার কথা কয়েকটি প্রতিবেদনে এসেছে।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কেপিআইভুক্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি প্রবেশমুখে চেকপোস্ট ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। রেলওয়ে পুলিশও দেশের রেলস্টেশন ও রেলপথে নিরাপত্তা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, নাশকতায় একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অর্থ জোগান ও ইন্ধনের তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এসেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বাইরে অবস্থানরত ওই গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে দেশের ভেতরের কর্মীদের যোগাযোগ এবং অর্থ পাঠানোর তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে। এসব অর্থের জোগানদাতা ও নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানান।
আতঙ্কই কি মূল লক্ষ্য?
ডিবির বক্তব্য অনুযায়ী, গণপরিবহণে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের একটি উদ্দেশ্য জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ—এমন ধারণা তৈরি করা। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের ছোট ছোট হামলা দ্রুত ঘটিয়ে আবার হামলাকারীদের সরে যাওয়ার কৌশল থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য আলাদা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
এ কারণে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন বাসে অগ্নিসংযোগ হিসেবে না দেখে পুলিশ ককটেল বিস্ফোরণ, গণপরিবহণে আগুন, রেলপথে নাশকতা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তাকে একই সামগ্রিক ঝুঁকির অংশ হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এখন তদন্তের কেন্দ্রে যে প্রশ্নগুলো
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর প্রকৃত চিত্র বের করতে তদন্তকারীদের সামনে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—
প্রথমত, যে বাসগুলোতে আগুন দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর প্রকৃত মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কার হাতে ছিল।
দ্বিতীয়ত, অগ্নিসংযোগের আগে ও পরে বাসমালিক, চালক, শ্রমিক এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না।
তৃতীয়ত, কোনো বাসের ক্ষেত্রে আগুন দেওয়ার পর বিমা কোম্পানিতে ক্ষতিপূরণের আবেদন করা হয়েছে কি না এবং হলে দাবির কারণ কী দেখানো হয়েছে।
চতুর্থত, ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বিত যোগাযোগ বা একই অর্থের উৎস রয়েছে কি না।
পঞ্চমত, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি ঘটনাস্থলে তাদের প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল এবং তদন্তে তার পক্ষে কী ধরনের প্রযুক্তিগত বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আর ষষ্ঠত, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে রেলপথ বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘিরে সংঘটিত ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো সাংগঠনিক যোগসূত্র রয়েছে কি না।
তদন্ত বনাম প্রচারণা—প্রমাণই শেষ কথা
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে পুলিশের বক্তব্য, মামলার এজাহার এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত গোয়েন্দা তথ্য থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
সাম্প্রতিক নাশকতার তদন্ত তাই এখন দুটি সমান্তরাল প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—কারা মাঠে গিয়ে আগুন ও বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে এবং কারা এর পেছনে অর্থ, নির্দেশনা বা সাংগঠনিক সহায়তা দিচ্ছে। প্রকাশ্যে আসা তথ্য বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের কাজ শুরু করেছে; একই সঙ্গে নাশকতার সম্ভাব্য অর্থের উৎস ও নির্দেশদাতাদেরও তদন্তের আওতায় আনার কথা জানিয়েছে।
রাজধানীর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে তদন্তের ফল প্রকাশ এবং প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযোগের সঙ্গে প্রমাণের সুনির্দিষ্ট যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করা। কারণ বাসে আগুনের ধোঁয়া দ্রুত মিলিয়ে গেলেও—সিসিটিভি, কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন, মালিকানা নথি ও মামলার তদন্ত শেষ পর্যন্ত বলে দিতে পারে, আগুনটি কেবল একটি যানবাহনে লেগেছিল, নাকি এর পেছনে ছিল আরও বিস্তৃত কোনো পরিকল্পনা।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন,সম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক। 











