মোঃ আলফাজ উদ্দিন
সম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক।
আমাদের এই বদ্বীপে মানুষের মগজ চিবিয়ে খাওয়ার নানাবিধ আয়োজন ইতিহাসজুড়ে সচল ছিল। এককালে আফিম আসত জাহাজে চড়ে, তারপর এলো ফেনসিডিল, হিরোইন আর হালের ইয়াবা। আমরা চিৎকার করলাম, সমাজ গোল্লায় গেল বলে মাতম তুললাম। কিন্তু আজ যে সর্বনাশের মুখোমুখি আমরা দাঁড়িয়েছি, তার রূপ চেনা বড় কঠিন। এই রাক্ষসের নাম ‘অনলাইন ক্যাসিনো’। এটি বোতল বা প্যাকেটে পুরে আসে না; আসে বিদ্যুতের গতিতে, মানুষের পকেটে থাকা ওই ছোট্ট কাচের স্ক্রিন তথা স্মার্টফোনের ভেতর দিয়ে। মাদক মানুষের লিভার-ফুসফুস পচায়, কিন্তু এই ডিজিটাল জুয়া মানুষের খোদ মনুষ্যত্ব, বিবেক এবং সমাজকাঠামোকে এক লহমায় গুঁড়ো করে দিচ্ছে। এটি মাদকাসক্তির চেয়েও বহুগুণ ভয়াবহ, এক পরম সংক্রামক ব্যাধি।
বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত ক্রান্তিকাল পার করছে। তরুণ সমাজের একটা বিরাট অংশ আজ এক অলীক স্বপ্নের পেছনে ছুটছে। তারা ভাবছে, একটা বোতাম টিপলেই বুঝি ভাগ্য খুলে যাবে। ২০ টাকার বাজি ধরে এক রাতেই কোটিপতি হওয়ার এই যে বুর্জোয়া ফ্যান্টাসি, এটি আসলে এক সুপরিকল্পিত ফাঁদ। এককালে জুয়া খেলার জন্য মানুষকে আড়ালে-আবডালে, নদীর চরে কিংবা অন্ধকার কোনো আড্ডায় যেতে হতো। সেখানে একটা সামাজিক লজ্জার বালাই ছিল। আজ অনলাইন ক্যাসিনো সেই লজ্জার দেয়ালটা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। এখন ড্রয়িংরুমে বাবার পাশে বসে কিংবা পড়ার টেবিলে মায়ের চোখের সামনে চাদর মুড়ি দিয়েও একটা তরুণ নিভৃতে তার সর্বস্ব খোয়াতে পারে। এই যে ‘লুকানো আসক্তি’, এর চেয়ে ভয়ংকর আর কী হতে পারে? মাদকের আসক্তি চোখে দেখা যায়—চোখ লাল হয়, শরীর ভেঙে পড়ে। কিন্তু অনলাইন জুয়াড়ির ক্ষয়টা ভেতর থেকে হয়, যা বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভার্চুয়াল জুয়া খেলার সময় মানুষের মগজে যে ডোপামিন নিঃসৃত হয়, তার তীব্রতা কোকেন বা হিরোইনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এটি এক প্রকার রাসায়নিকবিহীন মানসিক মাদক। মাদকাসক্ত মানুষ টাকার জন্য হয়তো ঘরের ঘটিবাটি চুরি করে, বড়জোর মায়ের গহনা বন্ধক রাখে। কিন্তু এই অনলাইন ক্যাসিনোর অ্যালগরিদম এমন এক রাক্ষুসে কায়দায় তৈরি যে, এখানে এক ক্লিকেই একজন মানুষ তার বাপদাদার ভিটেমাটি, সারা জীবনের সঞ্চয়, এমনকি নিজের আত্মসম্মানটুকু পর্যন্ত এক রাতে বিলীন করে দিতে পারে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে; দেনার দায়ে পিষ্ট হয়ে তরুণরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, মাদকাসক্তদের চেয়ে এই জুয়াড়িদের মধ্যে আত্মহত্যার হার কয়েক গুণ বেশি। এটি কেবল ব্যক্তিমানুষের মৃত্যু নয়, এটি একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্মের অপমৃত্যু।
সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, এই সর্বনাশা খেলার সুতোটি কিন্তু এদেশের মাটিতে নেই। এই ক্যাসিনো সাম্রাজ্যের মূল হোতারা বসে আছে দুবাই, নেপাল বা ইউরোপের কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে। তারা আমাদের দেশের কিছু দালাল আর অবৈধ মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের মাধ্যমে প্রতিদিন এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের কোটি কোটি টাকা হুন্ডি আর ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে দেশের বাইরে পাচার করে দিচ্ছে। রাষ্ট্র আজ আইন করছে, ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাস করে বড় বড় শাস্তির বিধান করা হচ্ছে। কিন্তু আমি বলি, শুধু জেল-জরিমানা আর আইনের লাঠি দিয়ে এই মহামারি থামানো যাবে না। যে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নৈতিকতার পচন ধরেছে, যেখানে সততার চেয়ে চটজলদি ধনী হওয়াকে সাফল্যের মাপকাঠি ধরা হয়, সেখানে আইন কেবল মশারির ফুটো দিয়ে হাতির প্রবেশের মতোই ব্যর্থ হবে।
এই বন্ধ্যাত্ব থেকে মুক্তির উপায় কী? আমাদের আত্মিক জাগরণ প্রয়োজন। তরুণদের এই সস্তা ও ক্ষণস্থায়ী মোহের জগৎ থেকে ফিরিয়ে এনে সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে হবে। পরিবারকে আবার তার পুরোনো দায়িত্বে ফিরতে হবে; মা-বাবাকে দেখতে হবে তাদের সন্তান স্ক্রিনের ওপারে কোন নরকের দরজায় কড়া নাড়ছে। রাষ্ট্রকে কেবল সাইবার অপরাধীদের ধরলেই চলবে না, এই সর্বগ্রাসী জুয়ার বিজ্ঞাপনের যে মহোৎসব চলছে ভার্চুয়াল দুনিয়ায়, তার টুঁটি চেপে ধরতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে জাতি তার তরুণদের মগজ আর শ্রমকে জুয়ার বোর্ডে বাজি ধরতে দেয়, সে জাতির ভবিষ্যৎ কোনোদিনই আলোকময় হতে পারে না। এই ডিজিটাল মহামারি রুখতে না পারলে, অচিরেই আমরা এক পঙ্গু এবং আত্মিকভাব দেউলিয়া প্রজন্মের মুখোমুখি হবো।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন সম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক। 
















