জনতার এই যে উত্তাল স্রোত- এক দিনে তৈরি হয়নি। এই স্রোতের প্রতিটি তরঙ্গে মিশে ছিল আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়ার সেই অবিনাশী স্পর্ধা, মুগ্ধর ‘পানি লাগবে, পানি?’—কণ্ঠের সেই চিরন্তন মানবিক আহ্বান। ৫ আগস্টের ভোরের আলোতে মিশে ছিল শত শত নাম না জানা বীরের রক্ত, যাঁরা নিজেদের বুক বুলেটের সামনে বিলিয়ে দিয়ে এই মুক্ত বাতাসের পথ তৈরি করে গেছেন। রাজপথে পা রাখতেই মনে হচ্ছিল, প্রতিটি ধূলিকণা যেন ফিসফিসিয়ে বলছিল—”আমরা হার মানব না, কারণ আমাদের ভাইদের রক্ত এখনো শুকায়নি।” শহীদদের সেই আত্মত্যাগই সেদিন কোটি জনতাকে বানিয়েছিল অপরাজেয়, প্রতিটি সাধারণ মানুষকে রূপ দিয়েছিল এক একজন নির্ভীক যোদ্ধায়।
৫ আগস্ট: প্রলয়ংকরী গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসনের পতন, নতুন বাংলায় নব সূর্যোদয়
মহান জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিক প্রতিবেদন (পর্ব–৬)
মোঃ আলফাজ উদ্দিন, সম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক।
২০২৪’-এর রক্তস্নাত জুলাইয়ের বুক চিরে জন্ম নেওয়া এক অবিনাশী গন আন্দোলন ও বাংলার দামাল ছাত্র-জনতার অদম্য, প্রলয়ংকরী ও আপসহীন দ্রোহের মুখে ধুলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল দীর্ঘ দেড় দশকের একচ্ছত্র ক্ষমতার দম্ভ । পতন হয়েছিল এক স্বৈরাচারী শাসনের, আর পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে লাখো কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল এক নতুন স্বাধীন ভোরের আগমনী গান ।
অবাধ্য সকাল ও ভয়ের দেয়াল ভাঙা জনস্রোত
৫ আগস্ট ২০২৪’-ভোরের আলো ফুটতেই ঢাকা রূপ নিয়েছিল এক থমথমে, স্তব্ধ ও অবরুদ্ধ নগরীতে। চারদিকে সাঁজোয়া যানের গর্জন আর বুটের আওয়াজ; মোড়ে মোড়ে ছিল রাইফেলের নল। কিন্তু সেদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলার আপামর জনতা ভয়ের সব দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। কারফিউর বজ্রআঁটুনি উপেক্ষা করে উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, শাহবাগ আর সায়েন্স ল্যাবরেটরির রাজপথে নেমে আসে লাখো মানুষের ঢল]। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—সব পথ এসে মিশেছিল ঢাকার বুকে। ঢাকার প্রবেশপথগুলো তখন আর কোনো রাস্তা ছিল না, তা ছিল শৃঙ্খল মুক্তির নেশায় বুঁদ হওয়া এক একটি উত্তাল মহাসমুদ্র।
রক্তিম স্মৃতির মিনার: শহীদদের আত্মদানেই এলো এ ভোর
জনতার এই যে উত্তাল স্রোত, তা কিন্তু এক দিনে তৈরি হয়নি। এই স্রোতের প্রতিটি তরঙ্গে মিশে ছিল আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়ার সেই অবিনাশী স্পর্ধা, মুগ্ধর ‘পানি লাগবে, পানি?’—কণ্ঠের সেই চিরন্তন মানবিক আহ্বান। ৫ আগস্টের ভোরের আলোতে মিশে ছিল শত শত নাম না জানা বীরের রক্ত, যাঁরা নিজেদের বুক বুলেটের সামনে বিলিয়ে দিয়ে এই মুক্ত বাতাসের পথ তৈরি করে গেছেন। রাজপথে পা রাখতেই মনে হচ্ছিল, প্রতিটি ধূলিকণা যেন ফিসফিসিয়ে বলছিল—”আমরা হার মানব না, কারণ আমাদের ভাইদের রক্ত এখনো শুকায়নি।” শহীদদের সেই আত্মত্যাগই সেদিন কোটি জনতাকে বানিয়েছিল অপরাজেয়, প্রতিটি সাধারণ মানুষকে রূপ দিয়েছিল এক একজন নির্ভীক যোদ্ধায়।
গাজীপুর: ঢাকার প্রবেশদ্বারে জনতার অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা
৫ আগস্ট ভোর থেকেই গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো আন্দোলনকারীদের উপস্থিতিতে উত্তাল হয়ে ওঠে। মাওনা চৌরাস্তা, হোতাপাড়া, রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা, শিববাড়ী মোড় এবং শিমুলতলী এলাকার ডুয়েট-সংলগ্ন সড়কে হাজারো শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ ঢাকামুখী জনস্রোতে যোগ দেন।
বিশেষ করে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল হওয়ায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের অংশগ্রহণ আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। অনেক এলাকায় স্থানীয় জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনকারীদের জন্য খাবার ও পানির ব্যবস্থা করেন। বিভিন্ন স্থানে সংক্ষিপ্ত বাধা সৃষ্টি হলেও বিপুল জনসমাগমের কারণে সড়কগুলো ক্রমেই আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং ঢাকার দিকে মানুষের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে।
শিমুলতলী এলাকায় ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)-এর শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের সমাবেশ দিনভর আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।
এই সময় গাজীপুর কার্যত রাজধানীর উত্তর প্রবেশপথে গণআন্দোলনের একটি প্রধান করিডরে পরিণত হয়। মাওনা থেকে শিববাড়ী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় মানুষের স্রোত এবং ঢাকামুখী অগ্রযাত্রা ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এক দম্ভের পতন এবং আকাশপথে পলায়ন
দুপুরের তপ্ত সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর, তখন গণভবনের দিকে ধেয়ে আসছিল লাখো কণ্ঠের বজ্রনিনাদ । চারদিকের ব্যারিকেড আর কাঁটাতারের বেড়া তখন জনতার সুতীব্র স্রোতের সামনে খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। অবশেষে ছাত্র-জনতার সেই অদম্য রুদ্ররোষ ও গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটে দীর্ঘদিনের অহংকারের]। দুপুর আড়াইটার দিকে একটি সামরিক হেলিকপ্টার যখন ঢাকার আকাশসীমা ছেড়ে উড়ে যায়, তখন চিরতরে অবসান ঘটে এক শ্বাসরুদ্ধকর অধ্যায়ের । বাংলার আকাশ থেকে মুছে যায় স্বৈরাচারের ছায়া, যার শেষ আশ্রয় হয় দিল্লির সীমানায় ।
নিষিদ্ধ দুর্গে জনতার উৎসব: রাজপ্রাসাদে মেহনতির পা
খবরটি রাষ্ট্র হওয়া মাত্রই ঢাকার আকাশ-বাতাস লহমায় কেঁপে ওঠে বাঁধভাঙা উল্লাসে । যে ‘গণভবন’ এতদিন ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে এক নিষিদ্ধ, দুর্গ—তার লৌহকপাট ভেঙে প্রবেশ করে শোষিত জনতা। দামি আসবাব, সুইমিং পুল, সবুজ লন আর রাজকীয় অন্দরমহলে হেঁটে বেড়ায় মেহনতি মানুষের ক্লান্ত পা । কেউ কেউ গণভবনের মাঠে বসে বিজয়ের নিশ্বাস নেয়, কেউবা ভেতরের জিনিসপত্র স্মারক হিসেবে উঁচিয়ে ধরে উল্লাস প্রকাশ করে । এই দৃশ্য ছিল কেবল কোনো ভবনে প্রবেশ নয়, বরং শোষকের ওপর শোষিতের বিজয়ের এক চিরন্তন লোকজ উৎসব।
ধ্বংসস্তূপ থেকে সৃজনশীলতা: তরুণদের হাত ধরে নতুন ক্যানভাস
বিকেলের আলো ফুরিয়ে যখন রাত নামল, তখন এক নতুন ভোরের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল এই আন্দোলনের মূল কারিগর—তরুণ প্রজন্ম। পরদিন সকাল হতেই চেনা রাজপথগুলো রূপ নিল এক অভূতপূর্ব নান্দনিক ক্যানভাসে। রাষ্ট্রের শৃঙ্খলার অভাবকে এক নিমিষে দূর করতে রাজপথে নেমে এল স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতিতে তীব্র রোদ আর বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, মুখে বাঁশি আর হাতে লাঠি উঁচিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে লাগল রাস্তার ট্রাফিক। লেন ধরে গাড়ি চালানো, হেলমেট ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা আর যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধে তাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়াস যেন এক সুসভ্য, নিয়মনিষ্ঠ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।
একই সাথে নগরের মলিন, বুলেটের ক্ষতচিহ্ন আর পোড়া দেয়ালগুলো সেজে উঠল শিল্পের ছোঁয়ায়। রঙের কৌটা আর তুলি হাতে তরুণরা মেতে উঠল দেয়ালচিত্র বা গ্রাফিতি আঁকার মহোৎসবে। সাধারণ ইটের দেয়ালগুলো কথা বলে উঠল সাম্য, মানবিকতা আর মুক্তির স্লোগানে। কোথাও ফুটে উঠল জলপাই রঙের ট্রাঙ্কের সামনে বুক পেতে দেওয়া বীরের অবয়ব, কোথাও ছোপ ছোপ রক্তের বুক চিরে লাল-সবুজের পতাকা, আবার কোথাও লেখা হলো—”বিকল্প কে? বিকল্প তরুণরা!” রঙের এই বিপ্লব কেবল দেয়াল রাঙাল না, তা স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া ক্ষতগুলোকে মুছে দিয়ে এক নতুন, সুন্দর ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে অমর করে রাখল।
নতুন বাংলার সূর্যোদয় ও আনন্দের ফল্গুধারা
৫ আগস্টের বিকেল এবং তার পরবর্তী দিনগুলো ছিল এক অপার্থিব সৌন্দর্যের। রাজপথে অচেনা মানুষও একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল । বাতাসে ভাসছিল লাল-সবুজের পতাকা, মাইকে বাজছিল স্বাধীনতার গান, আর চারদিকে চলছিল মিষ্টিমুখের মহোৎসব । রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক—সবাই সেদিন তরুণদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গেয়েছিল মুক্তির গান। এই বিজয়ের আলোতে বারবার ভেসে উঠছিল সেইসব মুখ, যাঁরা আমাদের এই দিনটি উপহার দিয়ে চিরতরে হারিয়ে গেছেন আকাশের তারায়।
৫ আগস্ট কেবল একটি সরকারের পতন ছিল না; এটি ছিল রক্তস্নাত জুলাইয়ের শত শত শহীদের পবিত্র আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এবং তরুণদের তুলিতে ও শ্রমে রাঙানো এক নতুন বাংলার পুনর্জন্মের মহাকাব্য ।
অবাধ্য সকাল ও ভয়ের দেয়াল ভাঙা জনস্রোত
ভোরের আলো ফুটতেই ঢাকা রূপ নিয়েছিল এক থমথমে, স্তব্ধ ও অবরুদ্ধ নগরীতে। চারদিকে সাঁজোয়া যানের গর্জন আর বুটের আওয়াজ; মোড়ে মোড়ে ছিল রাইফেলের নল। কিন্তু সেদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলার আপামর জনতা ভয়ের সব দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় । কারফিউর বজ্রআঁটুনি উপেক্ষা করে উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, শাহবাগ আর সায়েন্স ল্যাবরেটরির রাজপথে নেমে আসে লাখো মানুষের ঢল । টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—সব পথ এসে মিশেছিল ঢাকার বুকে। ঢাকার প্রবেশপথগুলো তখন আর কোনো রাস্তা ছিল না, তা ছিল শৃঙ্খল মুক্তির নেশায় বুঁদ হওয়া এক একটি উত্তাল মহাসমুদ্র।
বাংলার ইতিহাসে স্বাধীনতা, অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা বহু প্রজন্ম ধরে বিভিন্ন সময়ে নানা রূপে প্রকাশিত হয়েছে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী বিভিন্ন গণআন্দোলনের মতো ২০২৪ সালের মহান জুলাই গণআন্দোলনও সেই দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
এই ধারাবাহিক প্রতিবেদন নিবেদিত সেই সকল শহীদ, আহত, নির্যাতিত এবং সংগ্রামী মানুষদের প্রতি, যাঁদের আত্মত্যাগ ও সাহস জাতির ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই সকল ছাত্র, তরুণ, শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, প্রবাসী, গৃহিণী এবং অসংখ্য সাধারণ নাগরিককে—যাঁরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই গণআন্দোলনের অংশ হয়েছিলেন।
ইতিহাসের পাতায় ব্যক্তি নয়, টিকে থাকে আদর্শ, আত্মত্যাগ এবং মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। মহান জুলাই গণআন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি জাতিকে ন্যায়, জবাবদিহি, মানবিক মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রেরণা জোগাক—এই প্রত্যাশায় শেষ করছি “মহান জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিক প্রতিবেদন”।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন, সম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক। 
















