জেএসএস–ইউপিডিএফের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, সীমান্ত যোগাযোগ ও বিদেশি ইন্ধনের অভিযোগে বাড়ছে জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ
বিশেষ প্রতিবেদন-দৈনিক প্রান্তিক | ৩ নভেম্বর ২০২৬
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে আবারও অস্থিরতার ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে। রাঙামাটির সাজেক, খাগড়াছড়ির পানছড়ি ও সীমান্তবর্তী দুর্গম জনপদে দুই আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) মধ্যে সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। গোলাগুলি, পাল্টাপাল্টি হামলা, সড়ক অবরোধ, পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে বিপর্যয় এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কিন্তু পাহাড়ের এই অস্থিরতা কি কেবল আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই? নাকি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বৃহত্তর কোনো রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ? ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামকেন্দ্রিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, সীমান্তবর্তী এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টির কথিত পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পাহাড়ের চলমান সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তৃত এলাকায় অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এমনকি ডিসেম্বর নাগাদ জাতীয় রাজনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টির কথিত পরিকল্পনার সঙ্গেও পাহাড়ের পরিস্থিতিকে যুক্ত করে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আধিপত্যের লড়াইয়ে রক্তাক্ত পাহাড়
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ চলে আসছে। এর মধ্যে জেএসএসের সন্তু লারমাপন্থি অংশ এবং ইউপিডিএফের মধ্যে বিরোধ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে পানছড়ি ও সাজেক এলাকায় দুই পক্ষের উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ২৯ সেপ্টেম্বর সাজেকের চাইল্যাতলী এলাকায় গোলাগুলির ঘটনায় সঞ্জিতা ত্রিপুরা নামে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
গত অক্টোবরের শুরুতে পানছড়ি, নারাইছড়ি ও সাজেকের কয়েকটি এলাকায় জেএসএসের তৎপরতা বাড়ে। প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় অবস্থান শক্তিশালী করার অভিযোগ ওঠে সংগঠনটির বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, নিজেদের হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধারে ইউপিডিএফের তৎপরতার কথাও উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।
দুই পক্ষের এই সংঘাতে স্থানীয় জনপদে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গোলাগুলির কারণে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সংঘাতের পাশাপাশি সড়ক অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সীমান্তের ওপারে যোগাযোগের অভিযোগ
পাহাড়ের অস্থিরতার সঙ্গে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য ত্রিপুরা ও মিজোরামের যোগাযোগের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বক্তব্য ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ইউপিডিএফের সঙ্গে ত্রিপুরা এবং জেএসএসের সঙ্গে মিজোরামকেন্দ্রিক যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে। সীমান্তের দুর্গম পথ ব্যবহার করে সশস্ত্র সদস্যদের চলাচল ও আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষকের দাবি, পার্বত্য অঞ্চলে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র’)-এর পাশাপাশি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) তৎপরতাও রয়েছে। তাঁর মতে, পাহাড়ের সংঘাতকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির পাশাপাশি পর্যটননির্ভর অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার কৌশল থাকতে পারে।
আন্দোলনের আড়ালে কার স্বার্থ?
গত ১১ অক্টোবর থেকে সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ব্যানারে বিভিন্ন দাবিতে সড়ক অবরোধ শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে সাজেক থেকে জেএসএসের সন্তু লারমাপন্থি সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া, হামলার বিচার, আহতদের চিকিৎসা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
গত ২৬ অক্টোবর উজোবাজারে সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বৈঠক হয়। বৈঠকে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপিত হয়। তবে জেএসএসকে সরিয়ে দেওয়ার দাবির বিপরীতে উভয় সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব এলে আন্দোলনকারীদের আপত্তির বিষয়টি আলোচনায় আসে।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সরিয়ে দিয়ে অন্য গোষ্ঠীকে সেখানে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া সরকারের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়।
এখানেই আন্দোলনের প্রকৃত চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের দাবি অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু সেই দাবিকে ব্যবহার করে কোনো সশস্ত্র সংগঠন নিজেদের হারানো আধিপত্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে কি না, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়।
পুনর্বাসনের গুজব ও জাতিগত উত্তেজনার আশঙ্কা
সাজেক ও উদয়পুর এলাকায় নতুন করে সাত হাজার বাঙালিকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—এমন প্রচারণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে দাবি করা হয়েছে, এ ধরনের প্রচারণার একটি অংশ ভারত থেকে পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজের মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি, পুনর্বাসন ও জাতিগত পরিচয়ের প্রশ্ন অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ ধরনের যাচাইবিহীন তথ্য পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়াতে পারে। অতীতেও বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার নজির রয়েছে।
তাই পুনর্বাসনসংক্রান্ত কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলে তার নথি প্রকাশ করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের উৎস অনুসন্ধান করা জরুরি।
পর্যটন অর্থনীতিকে পঙ্গু করার পরিণতি
সাজেক শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি হাজারো মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত একটি অর্থনৈতিক জনপদ। পর্যটন, পরিবহন, হোটেল-রিসোর্ট, কৃষিপণ্য সরবরাহ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল এখানকার মানুষের জীবন।
চলমান সংঘাত ও অবরোধে সাজেকের সঙ্গে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ বা সীমিত হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। শতাধিক হোটেল ও রিসোর্ট বন্ধ থাকার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, শুধু যানবাহন খাতেই দৈনিক প্রায় ২৫ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। অন্যান্য রুটের ক্ষতি যোগ করলে পরিবহন খাতের ক্ষতি প্রায় ৪০ লাখ টাকায় পৌঁছায়। সামগ্রিক পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ দেড় কোটি টাকার বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। সংঘাতের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দায়ভার কিন্তু বহন করতে হচ্ছে পাহাড়ের শ্রমজীবী পরিবারগুলোকে।
জাতীয় নিরাপত্তায় নতুন করে ভাবনার সময়
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম, অন্যদিকে মিয়ানমারের সীমান্ত। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, সীমান্তবর্তী যোগাযোগপথ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ অঞ্চলটিকে নিরাপত্তার দিক থেকে সংবেদনশীল করে তুলেছে।
এ অঞ্চলে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার কিংবা সীমান্তের ওপার থেকে পরিচালিত কোনো নেটওয়ার্কের কার্যক্রম বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
বিশেষ করে কোনো বিদেশি শক্তি যদি স্থানীয় বিরোধকে ব্যবহার করে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, তাহলে বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
তবে পাহাড়ের মানুষের ন্যায্য রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে এক করে দেখারও সুযোগ নেই। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা, ভূমিসংক্রান্ত বিরোধের ন্যায়সংগত সমাধান এবং শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নের প্রশ্নের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সাজেকের সংঘাত এখন আর কেবল দুটি সংগঠনের পারস্পরিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ১ নভেম্বরও সাজেক এলাকায় জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে গোলাগুলির খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে অবরোধ ও পরিবহন ধর্মঘটের কারণে পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে।
পাহাড়ের দুর্গম জনপদে নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্ক অবস্থান, সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি এবং সাজেকের যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের উৎস, সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অর্থায়ন ও সীমান্তপারের যোগাযোগের বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আসছে।
বিশেষ প্রতিবেদন-দৈনিক প্রান্তিক | ৩ নভেম্বর ২০২৬ 










