Dhaka ১২:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজীপুরে শ্রমিক অবরোধে আওয়ামী ছায়া; আবারও বন্ধ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক

গাজীপুরের পোশাকশিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ ক্রমেই জটিল রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে গড়াচ্ছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো আন্দোলনে নেমেছেন পোশাকশ্রমিকরা। সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।

এদিকে শ্রমিক আন্দোলনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশ, উসকানি এবং সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ সামনে এসেছে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নয়জন নেতাকর্মীসহ গাজীপুরে মোট ৩০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

সোমবার সকালে পল্লীবিদ্যুৎ ও মৌচাক এলাকায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পল্লীবিদ্যুৎ, মৌচাক, সফিপুর ও হরিণঘাটিসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে শ্রমিকদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় অর্ধশতাধিক যানবাহন ও দোকানপাট ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতির কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার বেশ কয়েকটি কারখানা পুনরায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রায় এক হাজার শ্রমিক মহাসড়কে অবস্থান নেন। যান চলাচল স্বাভাবিক করতে শিল্প পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।

শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে রাজনৈতিক তৎপরতা ও সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগে কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। রোববার (১ নভেম্বর) ভোরে পরিচালিত অভিযানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নয়জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—গাজীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ সিকদার, শ্রমিক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হোসেন, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আরিফুল হোসেন, কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুম মিয়া, যুবলীগের সক্রিয় সদস্য মোহাম্মদ মেহেদী হাসান মিজান এবং আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ রাসেল, সৈকত শেখ ও মিজানুর রহমান।

পুলিশের অভিযোগ, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে যুক্ত হয়ে একটি পক্ষ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সময় নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজীপুর মহানগর পুলিশ ১৩ জন এবং শিল্প পুলিশ আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নয়জনসহ মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৩০।

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

শ্রমিক আন্দোলনে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। রোববার শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি অভিযোগ করেন, শ্রমিক আন্দোলনে ঢুকে আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলের লোকজন ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে।

অন্যদিকে শিল্প পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দিন পোশাকশিল্পের চলমান অস্থিরতায় রাজনৈতিক ইন্ধনের বিষয়টি সামনে এনেছেন। তাঁর ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু আইডিতে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা শনাক্ত করা হয়েছে। এসব মাধ্যমে শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা চলছে।

তবে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবির সঙ্গে সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে পৃথকভাবে বিবেচনার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৭ নভেম্বর পর্যন্ত তাদের মোতায়েন রাখার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

এর আগে রোববার গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় অন্তত ৪৫টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল।

পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবির মধ্যেই রোববার ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য এ বোর্ড কাজ করবে।

তবে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণার পরও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। শনিবার থেকে শুরু হওয়া অবরোধ, রোববারের সংঘর্ষ এবং সোমবার পুনরায় মহাসড়ক অবরোধের ঘটনায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

গাজীপুরে শ্রমিক অবরোধে আওয়ামী ছায়া; আবারও বন্ধ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক

গাজীপুরে শ্রমিক অবরোধে আওয়ামী ছায়া; আবারও বন্ধ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক

Update Time : ০৫:২৫:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

গাজীপুরের পোশাকশিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ ক্রমেই জটিল রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে গড়াচ্ছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো আন্দোলনে নেমেছেন পোশাকশ্রমিকরা। সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।

এদিকে শ্রমিক আন্দোলনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশ, উসকানি এবং সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ সামনে এসেছে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নয়জন নেতাকর্মীসহ গাজীপুরে মোট ৩০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

সোমবার সকালে পল্লীবিদ্যুৎ ও মৌচাক এলাকায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পল্লীবিদ্যুৎ, মৌচাক, সফিপুর ও হরিণঘাটিসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে শ্রমিকদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় অর্ধশতাধিক যানবাহন ও দোকানপাট ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতির কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার বেশ কয়েকটি কারখানা পুনরায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রায় এক হাজার শ্রমিক মহাসড়কে অবস্থান নেন। যান চলাচল স্বাভাবিক করতে শিল্প পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।

শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে রাজনৈতিক তৎপরতা ও সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগে কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। রোববার (১ নভেম্বর) ভোরে পরিচালিত অভিযানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নয়জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—গাজীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ সিকদার, শ্রমিক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হোসেন, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আরিফুল হোসেন, কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুম মিয়া, যুবলীগের সক্রিয় সদস্য মোহাম্মদ মেহেদী হাসান মিজান এবং আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ রাসেল, সৈকত শেখ ও মিজানুর রহমান।

পুলিশের অভিযোগ, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে যুক্ত হয়ে একটি পক্ষ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সময় নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজীপুর মহানগর পুলিশ ১৩ জন এবং শিল্প পুলিশ আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নয়জনসহ মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৩০।

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

শ্রমিক আন্দোলনে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। রোববার শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি অভিযোগ করেন, শ্রমিক আন্দোলনে ঢুকে আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলের লোকজন ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে।

অন্যদিকে শিল্প পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দিন পোশাকশিল্পের চলমান অস্থিরতায় রাজনৈতিক ইন্ধনের বিষয়টি সামনে এনেছেন। তাঁর ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু আইডিতে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা শনাক্ত করা হয়েছে। এসব মাধ্যমে শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা চলছে।

তবে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবির সঙ্গে সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে পৃথকভাবে বিবেচনার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৭ নভেম্বর পর্যন্ত তাদের মোতায়েন রাখার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

এর আগে রোববার গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় অন্তত ৪৫টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল।

পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবির মধ্যেই রোববার ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য এ বোর্ড কাজ করবে।

তবে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণার পরও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। শনিবার থেকে শুরু হওয়া অবরোধ, রোববারের সংঘর্ষ এবং সোমবার পুনরায় মহাসড়ক অবরোধের ঘটনায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।