ঢাকা | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজধানীর গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে শনিবার দিনভর উত্তেজনা ছড়িয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হকারদের ঘেরাওয়ের পর ভবনটি ঘিরে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার অভিযানে পতিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সন্দেহে ২৬০ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের পল্টন ও শাহবাগ থানায় নেওয়া হয়েছে।
দুই-তিনজন করে আসতে থাকেন
প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল ১০টা থেকেই শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউয়ের ৩৫ নম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত হোটেল গ্যানিস ইন্টারন্যাশনালের কর্নেল তাহের মিলনায়তনে জাসদ কার্যালয়ে লোকজন আসতে শুরু করেন।
তারা একসঙ্গে আসেননি। দুই-তিনজন করে বিভিন্ন দিক থেকে সেখানে প্রবেশ করেন। তাদের কয়েকজনকে আশপাশের বিভিন্ন হোটেল ও খাবারের দোকানেও অবস্থান করতে দেখা যায়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কার্যালয়ের ভেতরে সভা শুরু হয়।
এর কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শোনা যায় বলে স্থানীয় হকার ও ব্যবসায়ীরা জানান। বিষয়টি জানতে তারা দ্বিতীয় তলায় গেলে কার্যালয়ের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কয়েকবার নক করার পর একপর্যায়ে দরজা খোলা হলে ভেতরে বিপুলসংখ্যক মানুষকে দেখতে পান তারা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সেখানে চার শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় উপস্থিত লোকজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতির মধ্যে কয়েকজন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে চলে যান। পরে বিক্ষুব্ধ লোকজন ভবনের বাইরের কলাপসিবল গেট বন্ধ করে পুলিশকে খবর দেন।
সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার অভিযান
খবর পেয়ে পুলিশ পুরো ভবন ঘিরে ফেলে। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার অভিযান শেষে আটক ব্যক্তিদের পাঁচটি প্রিজনভ্যানে করে থানায় নেওয়া হয়। পল্টন থানায় এত বিপুলসংখ্যক মানুষ রাখার জায়গা না থাকায় তাদের একটি অংশকে শাহবাগ থানায় নেওয়া হয়।
শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের একটি অংশ বন্ধ করে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। যানবাহনকে বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভবনের সামনে উৎসুক মানুষের ভিড়। অভিযানের সময় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন স্লোগান দিতেও দেখা যায়।
জাসদ কার্যালয়ের পাশেই রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয়। ফলে ওই এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি এবং জাসদ কার্যালয়ের বৈঠককে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী, হকার ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
স্থানীয় কাপড় ব্যবসায়ী সবুজ জানান, জাসদ কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরেই লোকজনের আনাগোনা ছিল। শনিবার হকার ও ব্যবসায়ীরা দ্বিতীয় তলায় যাওয়ার পর সেখানে থাকা অনেককে দ্রুত সরে যেতে দেখা যায়।
শাহবাগ থানা বিএনপির কর্মী শরিফের দাবি, জাসদ কার্যালয়ের মিলনায়তনে পাঁচ শতাধিক মানুষ ছিলেন। তাদের অনেকে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে চলে যান। তিনি তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
জাসদ কার্যালয়ের ওই জমায়েতকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে আটক ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জাসদ কার্যালয়ের আড়ালে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট বিপুলসংখ্যক লোকজন জড়ো হয়েছিলেন। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এবং বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজনের আসার তথ্যও এ অভিযোগকে সামনে নিয়ে আসে।
তবে আটক ব্যক্তিদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করেনি পুলিশ। বরং তাদের পরিচয়, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পল্টন থানায় গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে দেশের বিভিন্ন থানায় বার্তা পাঠানো হয়েছে। তাদের কোনো মামলা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা পূর্ববর্তী সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট থানাগুলো থেকে তথ্য পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
‘নাশকতার পরিকল্পনা ছিল কি না’ খতিয়ে দেখছে পুলিশ
পুলিশ জানিয়েছে, জাসদ কার্যালয়ে কী উদ্দেশ্যে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়েছিলেন, সভায় কী আলোচনা হয়েছে এবং সেখানে কোনো ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়েছে।
আটকদের পল্টন থানার বিভিন্ন কক্ষে রাখা হয়েছে। লকআপে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ রাখার সুযোগ না থাকায় আপাতত তাদের বিভিন্ন কক্ষে রাখা হয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান।
যুবদলের ঘেরাও, ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
জাসদ কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়েছেন—এমন অভিযোগ তুলে যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে পল্টন থানা যুবদলের নেতাকর্মীরা কার্যালয়টি ঘিরে অবস্থান নেন। পরে সেখানে যুবদলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা একাধিক মিছিল করেন।
রবিউল ইসলাম নয়ন সাংবাদিকদের বলেন, বিদেশে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিচ্ছেন। তার অভিযোগ, জাসদ কার্যালয়ের ওই বৈঠকে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না, পুলিশকে তা খতিয়ে দেখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা যাতে ঢাকার কোথাও মিছিল-মিটিং করতে না পারে, সে বিষয়ে ঢাকা মহানগর যুবদলের প্রতিটি ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শাহবাগ থানা যুবদলের সদস্যসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন তপন দাবি করেন, কুষ্টিয়া, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এনে জাসদ কার্যালয়ে গোপন বৈঠক করা হচ্ছিল। দেশে জ্বালাও-পোড়াও করার উদ্দেশ্যেই ওই বৈঠক করা হচ্ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ করেনি পুলিশ।
পুলিশের বক্তব্য
ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের ডিসি মো. আকতার হোসেন জানান, জাসদ কার্যালয়ের ভেতরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে এবং সেখানে বৈঠক চলছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়।
পল্টন থানার ওসি আরিফুর ইসলাম জানান, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
জাসদের দাবি
তবে পুলিশের অভিযানের ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয় জাসদ। দলটির দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, শনিবার সকালে জাসদের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। সারা দেশ থেকে প্রায় ৪০০ নেতাকর্মী ওই সভায় যোগ দেন। সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়।
তার দাবি, সভা চলাকালে প্রথমে বিএনপির নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়ে জাসদের নেতাকর্মীদের মারধর করেন। ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্যরাও ছিলেন। পরে বিকেলে পুলিশ এসে নেতাকর্মীদের আটক করতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে সবাইকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
জাসদের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিনিধি সভা আয়োজন, মাইক ব্যবহার এবং নিরাপত্তার জন্য পুলিশের কাছে আগেই আবেদন করা হয়েছিল। গত ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার এবং ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের ডিসির কাছে এ বিষয়ে আবেদন করা হয় বলে দলটি জানায়। এ সংক্রান্ত চিঠিও রয়েছে বলে দাবি করেছে জাসদ।
তবে ওই আবেদনের ভিত্তিতে পুলিশ কোনো অনুমতি দিয়েছিল কি না, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইনুর সাজা, জাসদ কার্যালয়ের ঘটনাকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন
জাসদ কার্যালয়ের এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দলটির সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
গত ৩০ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করে। মামলায় তার বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তিনটি অভিযোগেই তাকে ১০ বছর করে সাজা দেওয়া হয়।
এরপর জাসদ কার্যালয়ে কয়েকশ মানুষের সমাবেশ, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এবং সেখানে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতির অভিযোগকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন—আটক ২৬০ ব্যক্তির মধ্যে কতজনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা রয়েছে, তারা কোন উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন এবং জাসদ কার্যালয়ের ওই সমাবেশে কোনো নাশকতার পরিকল্পনা ছিল কি না।
পুলিশের পরিচয় যাচাই ও তদন্ত শেষ হলে এসব প্রশ্নের উত্তর আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা।
একই ঘটনাকে ঘিরে জাসদের দাবি, এটি ছিল পূর্বনির্ধারিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা; অন্যদিকে পুলিশ ও স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে সন্দেহজনকভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের জমায়েত, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। ফলে জাসদ কার্যালয়ের শনিবারের ওই সমাবেশকে ঘিরে ‘প্রতিনিধি সভা’ নাকি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের গোপন সমাবেশ—এই প্রশ্নই এখন তদন্তের কেন্দ্রে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক প্রান্তিক। 










