Dhaka ০৯:৪০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্যান্টনমেন্ট থানার প্রত্যাহারিত ওসি রাকিবুল ডিবি হেফাজতে

পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পক্ষে আগ্রহ প্রকাশ, মাঠপর্যায়ের পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন, সেনাবাহিনীকে নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও পদায়ন নিয়ে নানা বক্তব্য—এমন একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ক্যান্টনমেন্ট থানার প্রত্যাহারিত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

অডিওটি ঘিরে ডিএমপি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাতে রাকিবুল হাসানকে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এর আগে তাঁকে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি পদ থেকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। অফিস আদেশে প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে ‘প্রশাসনিক কারণ’ উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিএমপির একাধিক সূত্র অডিওর কণ্ঠ রাকিবুল হাসানের বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে রাকিবুল হাসান দাবি করেছেন, অডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। ফলে অডিওটির উৎস, কণ্ঠের সত্যতা ও এর পেছনের প্রেক্ষাপট এখন তদন্তের কেন্দ্রে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওর প্রচারিত অংশে একজনকে রাকিবুল হাসানের কণ্ঠে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গে বলতে শোনা যায়—

‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে। কিচ্ছু হবে না, কিচ্ছু হবে না, আপনারা তো চিন্তাও করতে পারতেছেন না, রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল, ভয়ানক দুর্বল।… শেখ হাসিনার আসা উচিত। ডিসেম্বর আসা দেরি, এই মাসে আসা উচিত ছিল।… চলে আসলে এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।’

এরপর সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বলতে শোনা যায়—

‘সেনাবাহিনীতে কথা বলতে হবে… তোমরা (সেনাবাহিনী) নিউট্রাল থাকো… রাস্তা আমি দেখতেছি।’

রেকর্ডিংয়ের আরেক অংশে সেনাপ্রধানের হজে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে বলতে শোনা যায়—

‘হজ করতে গেছে সেনাপ্রধান, প্রধানমন্ত্রীরও যাওয়া উচিত ছিল।’

এরপর অডিওতে হাসির শব্দ শোনা যায়।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে আবারও বলতে শোনা যায়—

‘তোমরা ক্যান্টনমেন্টে থাকো। পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।… রাস্তার পুলিশ কিচ্ছু না… কিচ্ছু না পুলিশ।’

একজন কর্মরত থানার ওসির কণ্ঠে এমন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ায় রাজনৈতিক অবস্থান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং পুলিশের পেশাগত নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অডিওতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও বক্তব্য রয়েছে। কথিত রাকিবুল হাসানকে বলতে শোনা যায়—

‘সিনিয়র অফিসাররা সব বিএনপি করতেছে, আমরা তো আর বিএনপি করতেছি না…।’

এরপর পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতে শোনা যায়—

‘এই করার জন্য তো আমরা ডিপার্টমেন্টে আসি নাই, তোমরা (সিনিয়র অফিসাররা) খাবা-দাবা… নিয়ে থাকবা আর আমরা এসে রাস্তার…। পুলিশের কেউ কাজ করে না, খালি খালি ভালো সাজতেছ… ওসিরা বাসায় গিয়ে ঘুমায় আসতেছে… কেউ কোনো কাজ করতেছে না।’

এ বক্তব্যে পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, দায়িত্ব পালন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে।

অডিওর আরেকটি অংশে পুলিশের ওসি পদায়ন ও বদলি প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শোনা যায়।

অডিওতে পুলিশের কল্যাণ তহবিল এবং বিভিন্ন খাতে পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পোশাক, জুতা, তেল, কম্বলসহ বিভিন্ন খাতের প্রসঙ্গ এসেছে কথোপকথনে।

একপর্যায়ে ব্যক্তিগত একটি ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে কথিত রাকিবুল হাসানকে বলতে শোনা যায়—

‘আমি ভাটার একটা কাজ করে দিছি এক স্যারের… স্যারকে এক কোটি টাকা দিছি। স্যার আমার সাথে সম্পর্ক রাখছে…।’

অডিওর এই অংশে পুলিশের বদলি-পদায়ন ব্যবস্থা, প্রশাসনিক প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ অনিয়ম নিয়ে বিস্তর অভিযোগে করেন কথিত রাকিবুল।

অডিওর সবচেয়ে আলোচিত অংশ শেখ হাসিনার দেশে ফেরাকে ঘিরে। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা কেন বলছেন—শেখ হাসিনার আসা উচিত’, ‘ডিসেম্বর আসা দেরি’, ‘এই মাসে আসা উচিত ছিল—এ প্রশ্নের উত্তরও এখন গুরুত্বপূর্ণ।

আরও প্রশ্ন হচ্ছে, ‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে’—এমন বক্তব্যের ভিত্তি কী?

তিনি কি কোনো নির্দিষ্ট সূত্র থেকে এমন তথ্য পেয়েছিলেন?

‘সেনাবাহিনীতে কথা বলতে হবে’—এই কথার মাধ্যমে তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগের কথা বোঝাচ্ছিলেন?

একজন কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তার কাছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এমন কোনো তথ্য বা যোগাযোগের উৎস থাকলে তা কী ধরনের—সেটিও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে প্রকাশ্য আগ্রহ, সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য এবং পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে মন্তব্য—অডিওর এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

রাকিবুল হাসান কি কেবল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করছিলেন, নাকি কোনো রাজনৈতিক মহল কিংবা অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল?

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সময়ের কথা বলেছেন, তার উৎস কী?

সেনাবাহিনীকে ‘নিউট্রাল’ থাকার আহ্বান জানানোর পেছনে কোনো পূর্বপরিকল্পিত যোগাযোগ ছিল কি না?

পুলিশের অভ্যন্তরীণ পদায়ন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তিনি যে তথ্য তুলে ধরেছেন, সেগুলো তিনি কোথা থেকে জানতেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

কারণ একজন কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তার রাজনৈতিক অবস্থান, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে তাঁর বক্তব্য এবং একটি পতিত ও পলাতক রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্ভাব্য দেশে ফেরার বিষয়ে তাঁর আগ্রহ—এই তিনটি বিষয় একই কথোপকথনে উঠে এলে এর পেছনে কোনো বৃহত্তর যোগাযোগ বা পরিকল্পনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জনস্বার্থের বিষয়।

তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অডিওটির প্রযুক্তিগত সত্যতা।

পুলিশের একাধিক সূত্র অডিওর কণ্ঠ রাকিবুল হাসানের বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে রাকিবুল হাসান নিজেই দাবি করেছেন, অডিওটি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

তাই অডিওটির ফরেনসিক পরীক্ষা, মূল রেকর্ডিং উদ্ধার, সম্পাদনার চিহ্ন অনুসন্ধান এবং কথোপকথনের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ যাচাই করা জরুরি।

অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি পদ থেকে রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার রাতে তাঁকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। অডিওটির বিষয়ে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

তদন্তে এখন শুধু অডিওর কণ্ঠ শনাক্ত করাই নয়, বরং কথোপকথনের পূর্ণ প্রেক্ষাপট, এর উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং অডিওতে উঠে আসা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আর যদি অডিওটি কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হবে—কেন একজন কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে এমন অডিও তৈরি করা হলো এবং এর পেছনে কারা রয়েছে?

তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানেই এখন এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার অপেক্ষা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ক্যান্টনমেন্ট থানার প্রত্যাহারিত ওসি রাকিবুল ডিবি হেফাজতে

ক্যান্টনমেন্ট থানার প্রত্যাহারিত ওসি রাকিবুল ডিবি হেফাজতে

Update Time : ০৮:৩৪:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পক্ষে আগ্রহ প্রকাশ, মাঠপর্যায়ের পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন, সেনাবাহিনীকে নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও পদায়ন নিয়ে নানা বক্তব্য—এমন একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ক্যান্টনমেন্ট থানার প্রত্যাহারিত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

অডিওটি ঘিরে ডিএমপি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাতে রাকিবুল হাসানকে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এর আগে তাঁকে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি পদ থেকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। অফিস আদেশে প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে ‘প্রশাসনিক কারণ’ উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিএমপির একাধিক সূত্র অডিওর কণ্ঠ রাকিবুল হাসানের বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে রাকিবুল হাসান দাবি করেছেন, অডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। ফলে অডিওটির উৎস, কণ্ঠের সত্যতা ও এর পেছনের প্রেক্ষাপট এখন তদন্তের কেন্দ্রে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওর প্রচারিত অংশে একজনকে রাকিবুল হাসানের কণ্ঠে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গে বলতে শোনা যায়—

‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে। কিচ্ছু হবে না, কিচ্ছু হবে না, আপনারা তো চিন্তাও করতে পারতেছেন না, রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল, ভয়ানক দুর্বল।… শেখ হাসিনার আসা উচিত। ডিসেম্বর আসা দেরি, এই মাসে আসা উচিত ছিল।… চলে আসলে এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।’

এরপর সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বলতে শোনা যায়—

‘সেনাবাহিনীতে কথা বলতে হবে… তোমরা (সেনাবাহিনী) নিউট্রাল থাকো… রাস্তা আমি দেখতেছি।’

রেকর্ডিংয়ের আরেক অংশে সেনাপ্রধানের হজে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে বলতে শোনা যায়—

‘হজ করতে গেছে সেনাপ্রধান, প্রধানমন্ত্রীরও যাওয়া উচিত ছিল।’

এরপর অডিওতে হাসির শব্দ শোনা যায়।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে আবারও বলতে শোনা যায়—

‘তোমরা ক্যান্টনমেন্টে থাকো। পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।… রাস্তার পুলিশ কিচ্ছু না… কিচ্ছু না পুলিশ।’

একজন কর্মরত থানার ওসির কণ্ঠে এমন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ায় রাজনৈতিক অবস্থান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং পুলিশের পেশাগত নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অডিওতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও বক্তব্য রয়েছে। কথিত রাকিবুল হাসানকে বলতে শোনা যায়—

‘সিনিয়র অফিসাররা সব বিএনপি করতেছে, আমরা তো আর বিএনপি করতেছি না…।’

এরপর পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতে শোনা যায়—

‘এই করার জন্য তো আমরা ডিপার্টমেন্টে আসি নাই, তোমরা (সিনিয়র অফিসাররা) খাবা-দাবা… নিয়ে থাকবা আর আমরা এসে রাস্তার…। পুলিশের কেউ কাজ করে না, খালি খালি ভালো সাজতেছ… ওসিরা বাসায় গিয়ে ঘুমায় আসতেছে… কেউ কোনো কাজ করতেছে না।’

এ বক্তব্যে পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, দায়িত্ব পালন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে।

অডিওর আরেকটি অংশে পুলিশের ওসি পদায়ন ও বদলি প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শোনা যায়।

অডিওতে পুলিশের কল্যাণ তহবিল এবং বিভিন্ন খাতে পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পোশাক, জুতা, তেল, কম্বলসহ বিভিন্ন খাতের প্রসঙ্গ এসেছে কথোপকথনে।

একপর্যায়ে ব্যক্তিগত একটি ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে কথিত রাকিবুল হাসানকে বলতে শোনা যায়—

‘আমি ভাটার একটা কাজ করে দিছি এক স্যারের… স্যারকে এক কোটি টাকা দিছি। স্যার আমার সাথে সম্পর্ক রাখছে…।’

অডিওর এই অংশে পুলিশের বদলি-পদায়ন ব্যবস্থা, প্রশাসনিক প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ অনিয়ম নিয়ে বিস্তর অভিযোগে করেন কথিত রাকিবুল।

অডিওর সবচেয়ে আলোচিত অংশ শেখ হাসিনার দেশে ফেরাকে ঘিরে। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা কেন বলছেন—শেখ হাসিনার আসা উচিত’, ‘ডিসেম্বর আসা দেরি’, ‘এই মাসে আসা উচিত ছিল—এ প্রশ্নের উত্তরও এখন গুরুত্বপূর্ণ।

আরও প্রশ্ন হচ্ছে, ‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে’—এমন বক্তব্যের ভিত্তি কী?

তিনি কি কোনো নির্দিষ্ট সূত্র থেকে এমন তথ্য পেয়েছিলেন?

‘সেনাবাহিনীতে কথা বলতে হবে’—এই কথার মাধ্যমে তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগের কথা বোঝাচ্ছিলেন?

একজন কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তার কাছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এমন কোনো তথ্য বা যোগাযোগের উৎস থাকলে তা কী ধরনের—সেটিও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে প্রকাশ্য আগ্রহ, সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য এবং পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে মন্তব্য—অডিওর এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

রাকিবুল হাসান কি কেবল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করছিলেন, নাকি কোনো রাজনৈতিক মহল কিংবা অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল?

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সময়ের কথা বলেছেন, তার উৎস কী?

সেনাবাহিনীকে ‘নিউট্রাল’ থাকার আহ্বান জানানোর পেছনে কোনো পূর্বপরিকল্পিত যোগাযোগ ছিল কি না?

পুলিশের অভ্যন্তরীণ পদায়ন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তিনি যে তথ্য তুলে ধরেছেন, সেগুলো তিনি কোথা থেকে জানতেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

কারণ একজন কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তার রাজনৈতিক অবস্থান, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে তাঁর বক্তব্য এবং একটি পতিত ও পলাতক রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্ভাব্য দেশে ফেরার বিষয়ে তাঁর আগ্রহ—এই তিনটি বিষয় একই কথোপকথনে উঠে এলে এর পেছনে কোনো বৃহত্তর যোগাযোগ বা পরিকল্পনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জনস্বার্থের বিষয়।

তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অডিওটির প্রযুক্তিগত সত্যতা।

পুলিশের একাধিক সূত্র অডিওর কণ্ঠ রাকিবুল হাসানের বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে রাকিবুল হাসান নিজেই দাবি করেছেন, অডিওটি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

তাই অডিওটির ফরেনসিক পরীক্ষা, মূল রেকর্ডিং উদ্ধার, সম্পাদনার চিহ্ন অনুসন্ধান এবং কথোপকথনের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ যাচাই করা জরুরি।

অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি পদ থেকে রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার রাতে তাঁকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। অডিওটির বিষয়ে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

তদন্তে এখন শুধু অডিওর কণ্ঠ শনাক্ত করাই নয়, বরং কথোপকথনের পূর্ণ প্রেক্ষাপট, এর উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং অডিওতে উঠে আসা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আর যদি অডিওটি কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হবে—কেন একজন কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে এমন অডিও তৈরি করা হলো এবং এর পেছনে কারা রয়েছে?

তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানেই এখন এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার অপেক্ষা।