জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে পাঁচ আসামির সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন—কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পদের অর্থ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণে ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ছিল, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা, উসকানি ও সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় সশস্ত্র কর্মীদের ব্যবহার করেন। তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যায় প্ররোচনা, নির্যাতন এবং আন্দোলন দমনে সমন্বিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়।
ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের পক্ষে অবস্থান এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের সমন্বয়ের অভিযোগ আনা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মোট তিনটি কাউন্টে অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়েছিল।
মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য, আন্দোলন দমনে ভূমিকা এবং আন্দোলনের সংবাদ প্রচারে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভূমিকার অভিযোগও উপস্থাপন করে।
অন্য আসামিদের বিরুদ্ধেও আন্দোলন দমনে নিজ নিজ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থান থেকে নির্দেশ, প্ররোচনা, সমর্থন, তদারকি এবং সশস্ত্র হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ এসব কর্মকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করে।
মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চলে। রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন এবং অডিও-ভিডিওসহ ডিজিটাল আলামত উপস্থাপন করা হয়। অপরদিকে, পলাতক আসামিদের পক্ষে ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ করে। আসামিপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করে তাঁদের খালাসের আবেদন করে।
এর আগে ১২ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্কে সাত আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে। একই সঙ্গে তাঁদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের আবেদন জানানো হয়। ১৮ আগস্ট উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করে ট্রাইব্যুনাল।
মঙ্গলবার সেই রায়ে সাত আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। একই সঙ্গে পাঁচ আসামির সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণের জন্য ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রান্তিক প্রতিবেদন। 


















