গত বছরের ঈদযাত্রায় নানা ভোগান্তি, দুর্ঘটনা ও অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে জনঅসন্তোষের প্রেক্ষাপটে এবার নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেছেন, অতীতের ব্যত্যয় থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার সড়ক, রেল ও নৌপথে সমন্বিত নজরদারি এবং কঠোর ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রবিবার (১৭ মে) দুপুরে রাজবাড়ী পৌরসভার সম্মেলন কক্ষে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজন ও আহতদের মধ্যে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, “গত বছরের ঈদযাত্রায় কিছু ব্যত্যয় ছিল। এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়েছি। জনগণ যাতে স্বস্তিতে ও নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে, সেটিই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।”
তিনি জানান, ঈদকে সামনে রেখে দেশের মহাসড়ক, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও নৌঘাটগুলোতে বিশেষ নজরদারি থাকবে। হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল ও মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতও বাড়ানো হয়েছে।
সরকারি হিসাবে এবার ঈদে ঢাকা থেকে প্রায় দেড় কোটি মানুষ গ্রামের বাড়িতে যেতে পারেন উল্লেখ করে শেখ রবিউল আলম বলেন, “এত বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত আছি।”
ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “কেউ বাড়তি ভাড়া নিতে পারবে না। যাত্রী হয়রানি বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, প্রয়োজনে রুট পারমিটও বাতিল করা হবে।”
সম্প্রতি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকেও সরকার ঈদযাত্রা নিরাপদ রাখতে একাধিক সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে মহাসড়কে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে কন্ট্রোল রুম চালু, টোলপ্লাজায় যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং ঈদের আগে নির্দিষ্ট সময় ভারী যান চলাচল সীমিত রাখার বিষয় রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত ভাড়া ও চাঁদাবাজি ঠেকাতে মাঠে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথাও জানিয়েছে প্রশাসন।
তবে সরকারের এই আশ্বাসের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোর তিক্ত অভিজ্ঞতা। গত কয়েক বছরের ঈদযাত্রায় মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, অনিয়ন্ত্রিত মোটরসাইকেল চলাচল এবং ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে যমুনা সেতু ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানজট নিয়ে এবারও শঙ্কা রয়েছে বলে বিভিন্ন পরিবহন বিশ্লেষক মত দিয়েছেন।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বাসডুবির ঘটনাও প্রসঙ্গ আসে মন্ত্রীর বক্তব্যে। তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার পেছনে চালকের অদক্ষতা ও বাসটির ত্রুটির প্রমাণ মিলেছে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকের অদক্ষতা, অসচেতনতা ও স্বেচ্ছাচারিতাকেই বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, “প্রতি বছর দেশে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। এটি শুধু পরিসংখ্যান নয়, হাজারো পরিবারের আজীবনের কান্না। তাই দুর্ঘটনা কমাতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ করতে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ নিয়েও সরকার ভাবছে।
অনুষ্ঠানে গত ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় বাসডুবির ঘটনায় নিহত ২৬ জনসহ মোট ৬২ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকার চেক তুলে দেন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, বিআরটিএ চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ও পরিবহন মালিক সমিতির চেয়ারম্যান সাইফুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
জহিরুল ইসলাম -উপসম্পাদক -দৈনিক প্রান্তিক 




















