মাসিক বেতন সর্বোচ্চ ১১ হাজার টাকা, মোবাইল ভাতা, অবসরকালীন সুবিধা বৃদ্ধি ও নতুন নারী নিয়োগের ঘোষণা
নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক প্রান্তিক
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত গ্রাম পুলিশ মহাসমাবেশে দেশের তৃণমূল পর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মাসিক বেতন, অবসরকালীন আনুতোষিক ও যাতায়াত ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি মোবাইল ভাতা চালুর ঘোষণা দেন। বর্ধিত বেতন-ভাতার সিদ্ধান্ত ৭ নভেম্বর থেকেই কার্যকর হবে বলে জানান তিনি।
শনিবার (৭ নভেম্বর ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত এ মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব ঘোষণা দেন। তিনি সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সমাবেশস্থলে পৌঁছে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা গ্রাম পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন।
সাধারণ গ্রাম পুলিশের বেতন ১০ হাজার ৫০০ টাকা
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় সাধারণ গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মাসিক বেতন ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে গ্রাম পুলিশ প্রধানদের মাসিক বেতন ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অবসরকালীন আর্থিক সুবিধাও বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ গ্রাম পুলিশ সদস্যদের অবসরকালীন আনুতোষিক ৭০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ হাজার টাকা করা হয়েছে। গ্রাম পুলিশ প্রধানদের ক্ষেত্রে এই সুবিধা ৮০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
যোগাযোগ ও দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে প্রত্যেক গ্রাম পুলিশ সদস্যকে প্রতি মাসে ১৫০ টাকা করে মোবাইল ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
যাতায়াত ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। গ্রাম পুলিশ প্রধানদের সাপ্তাহিক থানায় হাজিরার যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছে। সাধারণ গ্রাম পুলিশের যাতায়াত ভাতা বাড়িয়ে ৫০০ টাকা নির্ধারণের তথ্যও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিটি ইউনিয়নে নতুন নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগ
গ্রামীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে নতুন করে দুজন নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
একই সঙ্গে নারী গ্রাম পুলিশ সদস্যদের জন্য ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি নির্ধারণের কথাও জানান তিনি। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে নারীদের কর্মসংস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গ্রাম পুলিশ সড়ক ও সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি
গ্রাম পুলিশ সদস্যদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা বাড়াতে প্রতিটি ইউনিয়নের একটি দীর্ঘ সড়কের নাম ‘গ্রাম পুলিশ সড়ক’ রাখার পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
এসব সড়কের পাশে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় গাছ লাগানো হবে। গাছগুলো বড় হওয়ার পর বিক্রি করে পাওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া গ্রাম পুলিশ সদস্যদের সাইকেল সরবরাহের সময়সীমা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পাঁচ বছর পরপর একটি করে সাইকেল দেওয়া হলেও তা কমিয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন বছরের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
তৃণমূলের নিরাপত্তায় গ্রাম পুলিশের ভূমিকা
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, দেশের প্রতিটি গ্রাম ও ইউনিয়ন নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশও নিরাপদ থাকবে। গ্রাম পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন। কোথায় কী ঘটছে, কোথায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে কিংবা কোথাও পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে কি না—এসব বিষয়ে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানার সুযোগ রয়েছে।
এসব তথ্য যথাসময়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানালে অপরাধ প্রতিরোধ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
তিনি বলেন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতিতে গ্রাম পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের অনেক কাজ সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। কিন্তু দায়িত্ব পালনের সময় তাঁদের একটি বিচক্ষণ সিদ্ধান্তও স্থানীয় পর্যায়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্রাম পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁদের আইনসম্মত, মানবিক, নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব হতে হবে। একটি নিরাপদ ইউনিয়ন গড়ে তুলতে স্থানীয় প্রশাসন, দায়িত্বশীল গ্রাম পুলিশ এবং সচেতন জনগণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
৪১ হাজার গ্রাম পুলিশের অংশগ্রহণ
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা প্রায় ৪১ হাজার গ্রাম পুলিশ সদস্য এ মহাসমাবেশে অংশ নেন। তাঁদের ব্যাপক উপস্থিতিতে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ড বিশাল জনসমাবেশে পরিণত হয়।
অনুষ্ঠানে দেশের আট বিভাগ থেকে নির্বাচিত আটজন শ্রেষ্ঠ গ্রাম পুলিশ সদস্যের হাতে বিশেষ সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মহাসমাবেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে গ্রাম পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব ও কার্যক্রম নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
বাংলাদেশের ইউনিয়ন পরিষদভিত্তিক স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গ্রাম পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, স্থানীয় প্রশাসনকে তথ্য সরবরাহ, অপরাধ প্রতিরোধে সহযোগিতা এবং দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁদের ভূমিকা রয়েছে।
মহাসমাবেশে ঘোষিত বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, অবসরকালীন সুবিধা, নারী নিয়োগ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়িত হলে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী এই বাহিনীর সদস্যদের আর্থিক ও পেশাগত অবস্থানে পরিবর্তন আসবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক প্রান্তিক 














