Dhaka ০১:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কোথায়? তার সামরিক সক্ষমতায়, অর্থনৈতিক ভিত্তিতে, রাজনৈতিক নেতৃত্বে, নাকি জনগণের সম্মিলিত চেতনায়? বাংলাদেশের স্বাধীনতাপরবর্তী ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এই প্রশ্নের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় হয়ে আছে। দিনটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং রাজনৈতিক অভিযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’—এই স্লোগানকে ধারণ করে ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে। দিনটির ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ঢাকা সেনানিবাসে সৈনিকদের অংশগ্রহণ, তাঁর মুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে তাঁর আবির্ভাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি, প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ ছিল রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।

স্বাধীনতার প্রথম কয়েক বছরে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের মুখোমুখি হতে হয়।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা চালু হয়। একই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ—বাকশাল গঠনের ঘোষণা আসে।

পরবর্তী সময়ে দেশের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বেও নতুন দায়িত্ববণ্টন তৈরি হয়।

২৫ আগস্ট ১৯৭৫ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এরপর ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নিয়ে আসে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ভোর। ঢাকা সেনানিবাসে সৈনিকদের অংশগ্রহণে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।

সেনানিবাসের বাইরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও লক্ষ করা যায়। সৈনিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সংহতির যে আবহ তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে জাতীয় পরিচিতি লাভ করে।

সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমানের মুক্তি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের নতুন অধ্যায়ের পথ তৈরি করে।

৭ নভেম্বরের তাৎপর্য কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তার মুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয়, রাষ্ট্রীয় সংহতি এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নেও দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। জাতীয় পরিচয়, গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন, বেসরকারি উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর শাসনামলে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়।

জিয়াউর রহমানের জাতীয় নেতৃত্বের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে।

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধান এবং পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের পর তাঁর নেতৃত্বের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

একজন মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে পৌঁছানোর এই যাত্রা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় দর্শন নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা চলছিল। ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ভূখণ্ড এবং মুক্তিযুদ্ধের অভিন্ন অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাকে রাষ্ট্রীয় দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

এই দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল বাংলাদেশের ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয়।

ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে বাংলাদেশের সব নাগরিককে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের আওতায় ঐক্যবদ্ধ করার ধারণা এতে গুরুত্ব পায়।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শনকে কেন্দ্র করে দলটির যাত্রা শুরু হয়।

পরবর্তী সময়ে বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলটির নেতৃত্ব, সাংগঠনিক বিস্তার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে।

জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় তাঁর শাসনামলে দেশব্যাপী খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

কর্মসূচিটির উদ্দেশ্য ছিল কৃষিজমিতে সেচের পানির সরবরাহ বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা কমানো এবং খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো। সাধারণ মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছরে তাঁর উদ্যোগে দেড় হাজারের বেশি খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়।

একই সময়ে ১৯৭৬-৭৭ এবং ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে খাদ্যশস্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথাও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে।

গ্রামীণ উন্নয়নের পাশাপাশি গণশিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তাঁর প্রবর্তিত গ্রাম সরকার ধারণার অন্যতম লক্ষ্য ছিল স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় সম্পদ ও উদ্যোগের মাধ্যমে স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পায়।

কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অবকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে উন্নয়ননীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল এই কর্মসূচিগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় খাতের প্রাধান্য ছিল। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বেসরকারি উদ্যোগের বিকাশ এবং উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে নীতিগত পরিবর্তন আসে।

শিল্পায়ন, কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, দেশীয় উদ্যোক্তা তৈরি এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বেসরকারি খাতের বিকাশের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এ সময় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়। ক্ষুদ্রঋণ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমও বিস্তৃত হতে থাকে।

অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিল্পায়ন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির যে ধারণা এ সময় গুরুত্ব পায়, তা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো বিকাশেও ভূমিকা রাখে।

স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা ছিল রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ গুরুত্ব পায়।

মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি চীন, পশ্চিমা দেশ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ ছিল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা।

১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন।

এই প্রস্তাবের লক্ষ্য ছিল অর্থনীতি, বাণিজ্য, কৃষি, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি।

দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনা ও প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায় ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা—সার্ক।

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ ছিল সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

সার্ক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়।

বাংলাদেশের উদ্যোগে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার এই ধারণা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত।

‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে যে জাতীয় সংহতির চেতনা প্রকাশ পেয়েছিল, তা দিনটির ঐতিহাসিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জিয়াউর রহমানের মুক্তি, পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব গ্রহণ এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শনের বিকাশ—সব মিলিয়ে ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়পর্বের সূচনা করে।

এই সময়পর্বে রাষ্ট্র পরিচালনায় কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বেসরকারি উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তাই একটি নির্দিষ্ট দিনের স্মৃতিচারণের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ের আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, প্রতি বছর ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দিনটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে পালনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

দিবসটি উপলক্ষে সরকার দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

সরকারি ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন সড়ক ও সড়কদ্বীপ জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করার কর্মসূচিও রয়েছে।

মসজিদে মিলাদ ও বিশেষ মোনাজাত এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন রাখা হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা ও রচনা প্রতিযোগিতা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকেও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, বিশেষ দরবার, মিলাদ মাহফিল ও প্রীতিভোজের আয়োজন রয়েছে।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের পথ নির্ধারণ করেছিল।

তিনি বলেন, সেদিনের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জাতীয় ঐক্যের প্রকাশ ঘটেছিল। জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও ছিল এই বিপ্লবের অন্যতম তাৎপর্য।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত এসব আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করেন।

দিবসটি উপলক্ষে বিএনপিও সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

৭ নভেম্বর সকালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং নয়াপল্টন থেকে কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। জেলা ও মহানগর পর্যায়েও দলীয় কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসে সৈনিকদের অংশগ্রহণ, বন্দিদশা থেকে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং রাজধানীর রাজপথে সৈনিক ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, ২০২৬ সালের ৭ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আলোচনা সভা ও রাজনৈতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই দিনের ৫১তম বার্ষিকী পালিত হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’

‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’

Update Time : ০৫:১০:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কোথায়? তার সামরিক সক্ষমতায়, অর্থনৈতিক ভিত্তিতে, রাজনৈতিক নেতৃত্বে, নাকি জনগণের সম্মিলিত চেতনায়? বাংলাদেশের স্বাধীনতাপরবর্তী ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এই প্রশ্নের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় হয়ে আছে। দিনটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং রাজনৈতিক অভিযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’—এই স্লোগানকে ধারণ করে ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে। দিনটির ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ঢাকা সেনানিবাসে সৈনিকদের অংশগ্রহণ, তাঁর মুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে তাঁর আবির্ভাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি, প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ ছিল রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।

স্বাধীনতার প্রথম কয়েক বছরে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের মুখোমুখি হতে হয়।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা চালু হয়। একই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ—বাকশাল গঠনের ঘোষণা আসে।

পরবর্তী সময়ে দেশের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বেও নতুন দায়িত্ববণ্টন তৈরি হয়।

২৫ আগস্ট ১৯৭৫ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এরপর ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নিয়ে আসে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ভোর। ঢাকা সেনানিবাসে সৈনিকদের অংশগ্রহণে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।

সেনানিবাসের বাইরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও লক্ষ করা যায়। সৈনিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সংহতির যে আবহ তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে জাতীয় পরিচিতি লাভ করে।

সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমানের মুক্তি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের নতুন অধ্যায়ের পথ তৈরি করে।

৭ নভেম্বরের তাৎপর্য কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তার মুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয়, রাষ্ট্রীয় সংহতি এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নেও দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। জাতীয় পরিচয়, গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন, বেসরকারি উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর শাসনামলে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়।

জিয়াউর রহমানের জাতীয় নেতৃত্বের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে।

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধান এবং পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের পর তাঁর নেতৃত্বের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

একজন মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে পৌঁছানোর এই যাত্রা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় দর্শন নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা চলছিল। ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ভূখণ্ড এবং মুক্তিযুদ্ধের অভিন্ন অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাকে রাষ্ট্রীয় দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

এই দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল বাংলাদেশের ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয়।

ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে বাংলাদেশের সব নাগরিককে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের আওতায় ঐক্যবদ্ধ করার ধারণা এতে গুরুত্ব পায়।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শনকে কেন্দ্র করে দলটির যাত্রা শুরু হয়।

পরবর্তী সময়ে বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলটির নেতৃত্ব, সাংগঠনিক বিস্তার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে।

জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় তাঁর শাসনামলে দেশব্যাপী খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

কর্মসূচিটির উদ্দেশ্য ছিল কৃষিজমিতে সেচের পানির সরবরাহ বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা কমানো এবং খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো। সাধারণ মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছরে তাঁর উদ্যোগে দেড় হাজারের বেশি খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়।

একই সময়ে ১৯৭৬-৭৭ এবং ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে খাদ্যশস্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথাও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে।

গ্রামীণ উন্নয়নের পাশাপাশি গণশিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তাঁর প্রবর্তিত গ্রাম সরকার ধারণার অন্যতম লক্ষ্য ছিল স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় সম্পদ ও উদ্যোগের মাধ্যমে স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পায়।

কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অবকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে উন্নয়ননীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল এই কর্মসূচিগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় খাতের প্রাধান্য ছিল। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বেসরকারি উদ্যোগের বিকাশ এবং উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে নীতিগত পরিবর্তন আসে।

শিল্পায়ন, কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, দেশীয় উদ্যোক্তা তৈরি এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বেসরকারি খাতের বিকাশের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এ সময় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়। ক্ষুদ্রঋণ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমও বিস্তৃত হতে থাকে।

অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিল্পায়ন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির যে ধারণা এ সময় গুরুত্ব পায়, তা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো বিকাশেও ভূমিকা রাখে।

স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা ছিল রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ গুরুত্ব পায়।

মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি চীন, পশ্চিমা দেশ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ ছিল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা।

১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন।

এই প্রস্তাবের লক্ষ্য ছিল অর্থনীতি, বাণিজ্য, কৃষি, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি।

দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনা ও প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায় ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা—সার্ক।

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ ছিল সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

সার্ক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়।

বাংলাদেশের উদ্যোগে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার এই ধারণা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত।

‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে যে জাতীয় সংহতির চেতনা প্রকাশ পেয়েছিল, তা দিনটির ঐতিহাসিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জিয়াউর রহমানের মুক্তি, পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব গ্রহণ এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শনের বিকাশ—সব মিলিয়ে ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়পর্বের সূচনা করে।

এই সময়পর্বে রাষ্ট্র পরিচালনায় কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বেসরকারি উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তাই একটি নির্দিষ্ট দিনের স্মৃতিচারণের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ের আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, প্রতি বছর ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দিনটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে পালনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

দিবসটি উপলক্ষে সরকার দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

সরকারি ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন সড়ক ও সড়কদ্বীপ জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করার কর্মসূচিও রয়েছে।

মসজিদে মিলাদ ও বিশেষ মোনাজাত এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন রাখা হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা ও রচনা প্রতিযোগিতা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকেও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, বিশেষ দরবার, মিলাদ মাহফিল ও প্রীতিভোজের আয়োজন রয়েছে।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের পথ নির্ধারণ করেছিল।

তিনি বলেন, সেদিনের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জাতীয় ঐক্যের প্রকাশ ঘটেছিল। জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও ছিল এই বিপ্লবের অন্যতম তাৎপর্য।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত এসব আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করেন।

দিবসটি উপলক্ষে বিএনপিও সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

৭ নভেম্বর সকালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং নয়াপল্টন থেকে কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। জেলা ও মহানগর পর্যায়েও দলীয় কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসে সৈনিকদের অংশগ্রহণ, বন্দিদশা থেকে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং রাজধানীর রাজপথে সৈনিক ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, ২০২৬ সালের ৭ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আলোচনা সভা ও রাজনৈতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই দিনের ৫১তম বার্ষিকী পালিত হবে।