Dhaka ০৫:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চলতি সংসদ অধিবেশনেই সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের আহ্বান মিয়া গোলাম পরওয়ারের

গাজীপুর, ১১ জুলাই: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জাতির প্রত্যাশা পূরণে আর বিলম্ব করা উচিত নয়; চলতি সংসদ অধিবেশনেই সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করতে হবে। গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করা হলে দেশকে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। তাই জাতিকে রাজপথে নামতে বাধ্য না করে দ্রুত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে গাজীপুরের পিটিআই অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, গাজীপুর মহানগরের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই সনদ: নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ জামাল উদ্দীনের সভাপতিত্বে এবং গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আইয়ুবীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।

বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, জুলাই জাতীয় সনদের মূল চেতনা থেকে সরে গিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চলছে। তার ভাষ্য, রক্তঝরা জুলাই আন্দোলনের সুফল ভোগ করে যারা আজ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, তাদেরই গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নে আন্তরিক হওয়া উচিত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে ভিন্নমত প্রকাশের মাধ্যমে সেই অঙ্গীকার থেকে সরে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এবং ৩৭টি নির্বাহী আদেশ বা নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়নের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রশাসন, স্থানীয় সরকার এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা জুলাই আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য ও জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিএনপির ভিন্নমতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব থেকে পৃথক রাখা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে উচ্চকক্ষের আসন অনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বণ্টন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের সীমিত স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য স্বাধীন নিয়োগ কমিশন গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। তার মতে, জনগণ ফ্যাসিবাদ ও দলীয়করণের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে; তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহিতা এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করতে জুলাই সনদের প্রতিটি সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি। তিনি ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের রায়কে সম্মান জানিয়ে অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন এবং সংস্কার কার্যক্রম শুরু করার আহ্বান জানান।

মূল প্রবন্ধে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ, আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য নিশ্চিত করাই সংবিধানের অন্যতম উদ্দেশ্য। সংবিধানবিরোধী কোনো সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে। তিনি আরও বলেন, জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত মালিক এবং জুলাই সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের যে রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে একটি জবাবদিহিমূলক, অংশগ্রহণমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।

সেমিনারে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সাবেক সচিব শেখ এ কে এম মোতাহার হোসেন এবং গাজীপুর জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর আবুল হাসেম খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন গাজীপুর জেলা জামায়াতের আমীর ড. জাহাঙ্গীর আলম, মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর মো. খায়রুল হাসান ও মো. হোসেন আলী।

এছাড়া বক্তব্য দেন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ শাকিলের পিতা মো. বেলায়েত হোসেন, মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা আজহারুল ইসলাম মোল্লা ও মো. আফজাল হোসেন, জামায়াতের নীতিনির্ধারণী কমিটির সদস্য ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে দলীয় মেয়রপ্রার্থী ড. হাফিজুর রহমান, এনসিপি নেতা হোসাইন আল মামুন, গাজীপুর আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শামসুল হক ভূঁইয়া, এনডিএফের গাজীপুর মহানগর সভাপতি ডা. আমজাদ হোসেন খান এবং ইঞ্জিনিয়ার মাহবুব আলম জামি।

বক্তারা বলেন, গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে জুলাই জাতীয় সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্পন্ন এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

জুলাই সনদ যেভাবে সই হয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়ন হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

চলতি সংসদ অধিবেশনেই সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের আহ্বান মিয়া গোলাম পরওয়ারের

Update Time : ১২:২৭:৪১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

গাজীপুর, ১১ জুলাই: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জাতির প্রত্যাশা পূরণে আর বিলম্ব করা উচিত নয়; চলতি সংসদ অধিবেশনেই সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করতে হবে। গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করা হলে দেশকে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। তাই জাতিকে রাজপথে নামতে বাধ্য না করে দ্রুত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে গাজীপুরের পিটিআই অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, গাজীপুর মহানগরের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই সনদ: নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ জামাল উদ্দীনের সভাপতিত্বে এবং গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আইয়ুবীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।

বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, জুলাই জাতীয় সনদের মূল চেতনা থেকে সরে গিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চলছে। তার ভাষ্য, রক্তঝরা জুলাই আন্দোলনের সুফল ভোগ করে যারা আজ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, তাদেরই গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নে আন্তরিক হওয়া উচিত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে ভিন্নমত প্রকাশের মাধ্যমে সেই অঙ্গীকার থেকে সরে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এবং ৩৭টি নির্বাহী আদেশ বা নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়নের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রশাসন, স্থানীয় সরকার এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা জুলাই আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য ও জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিএনপির ভিন্নমতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব থেকে পৃথক রাখা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে উচ্চকক্ষের আসন অনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বণ্টন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের সীমিত স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য স্বাধীন নিয়োগ কমিশন গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। তার মতে, জনগণ ফ্যাসিবাদ ও দলীয়করণের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে; তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহিতা এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করতে জুলাই সনদের প্রতিটি সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি। তিনি ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের রায়কে সম্মান জানিয়ে অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন এবং সংস্কার কার্যক্রম শুরু করার আহ্বান জানান।

মূল প্রবন্ধে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ, আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য নিশ্চিত করাই সংবিধানের অন্যতম উদ্দেশ্য। সংবিধানবিরোধী কোনো সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে। তিনি আরও বলেন, জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত মালিক এবং জুলাই সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের যে রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে একটি জবাবদিহিমূলক, অংশগ্রহণমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।

সেমিনারে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সাবেক সচিব শেখ এ কে এম মোতাহার হোসেন এবং গাজীপুর জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর আবুল হাসেম খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন গাজীপুর জেলা জামায়াতের আমীর ড. জাহাঙ্গীর আলম, মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর মো. খায়রুল হাসান ও মো. হোসেন আলী।

এছাড়া বক্তব্য দেন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ শাকিলের পিতা মো. বেলায়েত হোসেন, মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা আজহারুল ইসলাম মোল্লা ও মো. আফজাল হোসেন, জামায়াতের নীতিনির্ধারণী কমিটির সদস্য ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে দলীয় মেয়রপ্রার্থী ড. হাফিজুর রহমান, এনসিপি নেতা হোসাইন আল মামুন, গাজীপুর আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শামসুল হক ভূঁইয়া, এনডিএফের গাজীপুর মহানগর সভাপতি ডা. আমজাদ হোসেন খান এবং ইঞ্জিনিয়ার মাহবুব আলম জামি।

বক্তারা বলেন, গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে জুলাই জাতীয় সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্পন্ন এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।