বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা
২ জুন, ২০২৬
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচন ঘিরে বিশ্ব কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তর। এবারের নির্বাচনে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। দীর্ঘ চার দশক পর আবারও এই মর্যাদাপূর্ণ পদে বাংলাদেশের প্রার্থী হওয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার এক গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১৯৮৬ সালে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদা নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়ের ধারাবাহিকতায় এবার বাংলাদেশের পক্ষে লড়ছেন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন কেবল একটি পদ অর্জনের প্রতিযোগিতা নয়; বরং বৈশ্বিক রাজনীতি ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার এক বিরল সুযোগ।
বৈশ্বিক নেতৃত্বে বাংলাদেশের সম্ভাবনা:
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদ বিশ্ব কূটনীতির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান। এ পদে বাংলাদেশের জয় দেশের পরিপক্ব কূটনৈতিক নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হবে। শান্তি প্রতিষ্ঠা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, টেকসই উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও প্রভাব বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এজেন্ডা নির্ধারণে কৌশলগত সুবিধা:
সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদ শুধু আনুষ্ঠানিক মর্যাদার নয়; এটি আন্তর্জাতিক এজেন্ডা নির্ধারণের একটি কার্যকর কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম। সভাপতির দায়িত্বে থাকা দেশ এক বছরের জন্য সাধারণ বিতর্ক, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং বৈশ্বিক আলোচনার অগ্রাধিকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ নিজের জাতীয় স্বার্থ ও উন্নয়ন-অগ্রাধিকারের বিষয়গুলোকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারবে।
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির সুযোগ:
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভার বহন করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো রাজনীতির কারণে সংকটটি ধীরে ধীরে বিশ্ব মনোযোগের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পেলে রোহিঙ্গা সংকটকে আবারও বৈশ্বিক এজেন্ডার শীর্ষে নিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ অধিবেশন, সভাপতির ঘোষণা কিংবা আন্তর্জাতিক রেজুলেশনের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়ে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের দাবিকে জোরালো করা সম্ভব হতে পারে।
জলবায়ু বিচার ও ক্ষতিপূরণ তহবিল:
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না হয়েও বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। এই বাস্তবতায় সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ ‘গ্লোবাল সাউথ’ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম মুখপাত্রে পরিণত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অর্থায়ন নিশ্চিত করা, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে বাংলাদেশ কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারবে।
এলডিসি উত্তরণ ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ:
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করছে। তবে এই উত্তরণের ফলে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণ ও আন্তর্জাতিক সহায়তার কিছু সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চ ব্যবহার করে বাংলাদেশ এলডিসি-উত্তর দেশগুলোর জন্য ‘স্মুথ ট্রানজিশন’ বা সহজ রূপান্তরকাল এবং বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবে।
অভিবাসী অধিকার ও রেমিট্যান্স সুরক্ষা:
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি প্রবাসী আয়। অভিবাসী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণের ব্যয় কমানো এবং অভিবাসী অধিকার সুরক্ষায় বৈশ্বিক ঐকমত্য গঠনের ক্ষেত্রেও এই নেতৃত্ব কার্যকর হতে পারে।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর সুযোগ:
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রযুক্তিগত বৈষম্য উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ডিজিটাল সমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নেতৃত্ব দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত ও তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর হিসেবে বাংলাদেশ:
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব পেলে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারবে।
এতে বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্ব আরও সুদৃঢ় হবে।
শান্তিরক্ষা মিশনে নতুন মর্যাদা:
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ সৈন্য প্রেরণকারী দেশ। সভাপতির দায়িত্ব পেলে শান্তিরক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক নীতিমালায় আরও প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।
এর ফলে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের ভাবমূর্তিও আরও উজ্জ্বল হবে।
কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ:
নির্বাচনকে ঘিরে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ে বাংলাদেশ যে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে, তা নতুন নতুন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার যেসব দেশে বাংলাদেশের সরাসরি কূটনৈতিক উপস্থিতি সীমিত, সেসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত যোগাযোগ সম্প্রসারণের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতা:
তবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের জন্য যেমন সম্ভাবনার, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জেরও। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থনপুষ্ট সাইপ্রাসের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে জয় পেতে হলে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক তৎপরতা ও কার্যকর লবিং।
তবে ফলাফল যাই হোক, দীর্ঘ চার দশক পর জাতিসংঘের এই শীর্ষ পদে বাংলাদেশের দৃঢ় উপস্থিতি স্পষ্ট করে যে, বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন আর কেবল দর্শক নয়; বরং ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠছে।
বিশেষ প্রতিবেদক 















