সাইপ্রাসের নিকোসিয়া জেলা আদালত বাংলাদেশ সরকারের পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা (MLA) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) এবং তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেট সম্পদ ক্রোক বা জব্দ করার ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছে। গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখে সাইপ্রাসের অর্থপাচারবিরোধী ইউনিট (মোকাস)-এর আবেদনের ভিত্তিতে এই নির্দেশ আসে, যা দেশটির শীর্ষ গণমাধ্যম সাইপ্রাস মেইল এবং দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোতে বিশদভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক প্রান্তিক – ঢাকা, ২৯ মে।
সাইপ্রাসের নিকোসিয়া জেলা আদালত বাংলাদেশ সরকারের পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা (MLA) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) এবং তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেট সম্পদ ক্রোক বা জব্দ করার ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছে। গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখে সাইপ্রাসের অর্থপাচারবিরোধী ইউনিট (মোকাস)-এর আবেদনের ভিত্তিতে এই নির্দেশ আসে, যা দেশটির শীর্ষ গণমাধ্যম সাইপ্রাস মেইল এবং দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোতে বিশদভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
আর্থিক খাতে নজিরবিহীন ঋণ জালিয়াতি এবং দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অবশেষে আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধাক্কা খেলেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম। বাংলাদেশ সরকারের প্রেরিত পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা অনুরোধের (MLAR) ওপর ভিত্তি করে সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোসিয়ার জেলা আদালত এস আলম ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীনের সম্পদ জব্দের নির্দেশ জারি করেছে। ইউরোপের এই দ্বীপরাষ্ট্রে পাচার করা অর্থ ও অবৈধ সম্পদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে এটিকে বাংলাদেশ সরকারের একটি বড় কূটনৈতিক ও আইনি সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জব্দের বিবরণ ও নেপথ্যের ঘটনা
সাইপ্রাসের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘সাইপ্রাস মেইল’ এবং ‘সাইপ্রাস ইনফর্ম’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখে দেশটির অর্থপাচারবিরোধী বিশেষ ইউনিট ‘মোকাস’ (MOKAS) আদালতে সম্পদ জব্দের আবেদন জানায়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সাইপ্রাসের লিমাসুল জেলার পারেক্লিসিয়া এলাকায় অবস্থিত এস আলম দম্পতির একটি বিলাসবহুল দ্বিতল আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ক্রোক করা হয়েছে। এই আদেশের ফলে সম্পত্তিটি কোনোভাবে বিক্রি, হস্তান্তর বা রূপান্তর করা যাবে না।
‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ ও অফশোর সাম্রাজ্যের হদিসঃ
বাংলাদেশি গোয়েন্দা ও আন্তর্জাতিক নথির সূত্রে জানা গেছে, সাইফুল আলম ২০১৬ সালে সাইপ্রাসের বিতর্কিত ‘সিটিজেন-বাই-ইনভেস্টমেন্ট’ বা ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে সপরিবারে দেশটির নাগরিকত্ব কিনেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্বও গ্রহণ করেন।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৬ সালেই তিনি সাইপ্রাসে ‘এক্লেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান কিনে সেটির নাম পরিবর্তন করে ‘এক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনাল’ রাখেন। বাংলাদেশি তদন্তকারীদের দাবি, ভুয়া ও ওভার-ইনভয়েসিং বাণিজ্য অর্থায়নের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের একাধিক শীর্ষ ব্যাংক থেকে লোপাট করা টাকা এই অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে সাইপ্রাসে স্থানান্তর করা হয়েছিল। আদালতের নথিতে সাইপ্রাস ছাড়াও ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ এবং জার্সি আইল্যান্ডে এই চক্রের জটিল ট্রাস্ট ও অফশোর নেটওয়ার্কের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
৮০০ কোটি ইউরোর মহালুটের তদন্তঃ
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এস আলম সিন্ডিকেট বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি ইউরোর (৮ বিলিয়ন ইউরোর বেশি) সমপরিমাণ অর্থ অবৈধ উপায়ে বিদেশে পাচার করেছে। এই বিপুল পরিমাণ পাচারকৃত অর্থ মূলত সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর এবং যুক্তরাজ্যের রিয়েল এস্টেট ও ব্যাংকিং সিস্টেমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এক দিনে দুই দেশের আদালতে আইনি থাবাঃ
সাইপ্রাসের আদালতের এই সম্পদ জব্দের আদেশের মাত্র এক দিন পরই, গত ২৮ মে ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশের একটি বিশেষ আদালত এস আলম এবং তাঁর পরিবারের ১০ জন সদস্য ও সহযোগীকে ৫ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে একটি ভুয়া ভোজ্যতেল ও পরিবহন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৬০ লাখ ইউরো (প্রায় ৮০ কোটি টাকা) ঋণ নিয়ে তা আত্মসাতের মামলায় এই সাজা দেওয়া হয়।
এস আলমের পক্ষ থেকে আইনি লড়াইয়ের চেষ্টাঃ
আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থা ‘কুইন ইমানুয়েল’-এর মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে সাইফুল আলম তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, বিদেশে তাঁর সমস্ত বিনিয়োগ সম্পূর্ণ বৈধ আন্তর্জাতিক উৎস থেকে এসেছে। এই সম্পদ ক্রোকের পদক্ষেপকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দিয়ে তিনি ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থায় (ICSID) বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন, যেখানে তিনি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির দোহাই দিয়ে নিজের সম্পদ রক্ষার শেষ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
দৈনিক প্রান্তিক-এর পর্যবেক্ষণ
বিশ্লেষকদের মতে, পতিত সরকারের ঘনিষ্ঠ এই প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিদেশি সম্পদ ক্রোকের ঘটনাটি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় একটি মাইলফলক। সিঙ্গাপুর ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জসহ বিশ্বের অন্য যে সমস্ত দেশে এস আলমের সম্পদ রয়েছে, সাইপ্রাসের এই রায়ের সূত্র ধরে সেসব দেশেও সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে বলে আশা করছে দেশের সচেতন মহল।
বিশেষ প্রতিবেদক 

















