একটি জাতির পরিচয় কেবল তার ভাষা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় তার ইতিহাস, ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং মানুষের সম্মিলিত জীবনবোধের মাধ্যমে। একই ভাষায় কথা বলেও ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠী আলাদা জাতীয় পরিচয় ধারণ করতে পারে। বিশ্বের বহু জাতির ইতিহাসই এ সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ব্যতিক্রম নয়।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সাম্প্রতিক বক্তব্য—“বাঙালি পরিচয়ের জন্য সীমান্তের ওপারের কারও সার্টিফিকেটের প্রয়োজন নেই”—বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকলেও এর গভীরে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। বাংলাদেশের মানুষ তাদের পরিচয় অর্জন করেছে দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং রাষ্ট্রগঠনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। সেই পরিচয়ের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য বাইরের কোনো স্বীকৃতির প্রয়োজন হয় না।
বাংলাদেশের ভূখণ্ড মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইল। কিন্তু এই ছোট ভূখণ্ডের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। হাজার বছরের নদীমাতৃক সভ্যতা, কৃষিনির্ভর জীবন, লোকজ সংস্কৃতি, বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্যের মেলবন্ধন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে এক স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক মনোজগৎ। এই মনোজগৎ পশ্চিমবঙ্গ বা অন্য কোনো বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের সঙ্গে ভাষাগত মিল থাকলেও অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন।
ভাষা মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু জাতীয় পরিচয় গঠনের একমাত্র ভিত্তি নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষ একই ভাষায় কথা বললেও তাদের রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক ইতিহাস, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং সামাজিক বিবর্তনের পথ এক নয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের যাত্রা এ দেশের মানুষের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় চেতনা সৃষ্টি করেছে। এই চেতনা কেবল ভাষার নয়; এটি স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের চেতনা।
বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় নিয়ে আলোচনায় ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ধারণা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই ধারণাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুস্পষ্ট রূপ দেন। তাঁর দর্শনের মূল বক্তব্য ছিল—বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র, ভূখণ্ড, সংস্কৃতি এবং সার্বভৌম রাজনৈতিক অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। এর মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়ের পরিসর ভাষাভিত্তিক সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে একটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ও ভূখণ্ডভিত্তিক রূপ লাভ করে।
ইতিহাসে দেখা গেছে, বিভিন্ন সময়ে কিছু গোষ্ঠী বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্যকে খাটো করে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক বা আঞ্চলিক পরিচয়ের মধ্যে একে বিলীন করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতন। কারণ জাতীয় পরিচয় কোনো কৃত্রিম নির্মাণ নয়; এটি মানুষের জীবনসংগ্রাম ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে।
আধুনিক বিশ্বে জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পরস্পরের বিরোধী নয়। বাংলাদেশ যেমন নিজের সার্বভৌম পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়, তেমনি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। জাতিসংঘ, সার্ক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে আত্মপরিচয়ের দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই বৃহত্তর মানবিক ও আঞ্চলিক ঐক্যের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি এবং গণআন্দোলনের বিভিন্ন অধ্যায়ও দেশের মানুষের আত্মপরিচয়বোধকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। জনগণের প্রত্যাশা আজ একটি জবাবদিহিমূলক, গণতান্ত্রিক এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রব্যবস্থা। এই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের সত্যকে সম্মান করা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যয়।
ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—যে জাতি নিজের পরিচয় সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী, তাকে বাইরের কোনো শক্তি সহজে বিভ্রান্ত করতে পারে না। আত্মপরিচয় কখনো ধার করা যায় না; এটি অর্জন করতে হয়। বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয়ও তেমনি দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ এবং রাষ্ট্রগঠনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়েছে।
তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব, সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা এবং জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে কোনো ধরনের পরনির্ভরশীলতার স্থান নেই। ভাষার ঐক্যকে সম্মান জানিয়ে, ইতিহাসের সত্যকে ধারণ করে এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদাকে সমুন্নত রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কারণ আত্মমর্যাদাসম্পন্ন একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি তার নিজস্ব পরিচয়ের প্রতি অটল আস্থা। সেই আস্থাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার প্রধান ভিত্তি।
এমন এক সময়ে, যখন নানা মহল থেকে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয়কে বিভ্রান্ত করার কিংবা সংকীর্ণ সাংস্কৃতিক বয়ানের মধ্যে আবদ্ধ করার চেষ্টা দেখা যায়, তখন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন উচ্চারণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে বাংলাদেশের জনগণের আত্মপরিচয়, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা কোনো বাইরের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়; এর ভিত্তি এ দেশের ইতিহাস, সংগ্রাম এবং জনগণের সম্মিলিত চেতনা।
জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্নে তথ্যমন্ত্রীর দৃঢ় অবস্থানের জন্য তিনি নিঃসন্দেহে অভিনন্দন ও সাধুবাদের দাবিদার। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র জাতীয় সত্তার পক্ষে এমন স্পষ্ট বক্তব্য জাতির আত্মবিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করবে বলেই প্রত্যাশা। ভবিষ্যতেও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে দেশের স্বাধীন পরিচয় ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় একই ধরনের দৃঢ়তা ও স্পষ্ট অবস্থান জাতি প্রত্যাশা করে।
মোঃ আলফাজ উদ্দিন, সম্পাদক- দৈনিক প্রান্তিক। 























