Dhaka ০৫:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিভক্তির ছায়ায় হেফাজতে ইসলাম: ঐক্যের চেষ্টা নাকি নতুন বাস্তবতা?

ইনভেস্টিগেটিভ প্রান্তিক প্রতিবেদন

কওমি মাদরাসাভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন -“হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ”- আবারও দাঁড়িয়ে আছে এক জটিল সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। এক সময়ের ব্যাপক গণআন্দোলন-ভিত্তিক শক্তি হিসেবে পরিচিত এই সংগঠনটি এখন অভ্যন্তরীণ বিভাজন, নেতৃত্ব সংকট এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে।


সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যক্রম দীর্ঘ বিরতির পর সীমিত পরিসরে পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা দেখা গেলেও, শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যকার মতভেদ ও আস্থাহীনতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি।


নেতৃত্ব সংকট ও সাংগঠনিক স্থবিরতা
২০২০ সালে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর থেকে হেফাজতের নেতৃত্ব কাঠামো ধারাবাহিক পরিবর্তন ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে গেছে। একের পর এক আমির ও মহাসচিব পরিবর্তন, গ্রেপ্তার-নির্যাতন, এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সংগঠনটির সাংগঠনিক ধারাবাহিকতাকে দুর্বল করেছে।
বিশেষ করে ২০২১ সালের পর থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যক্রম কার্যত অনিয়মিত হয়ে পড়ে। একাধিক অংশে বিভক্ত নেতৃত্বের কারণে জাতীয় পর্যায়ে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয়নি, যা সংগঠনটির ঐতিহ্যগত “ইস্যুভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন” চরিত্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।


সাম্প্রতিক বিভাজন ও বহিষ্কার সিদ্ধান্ত
সম্প্রতি সংগঠনটির ভোলা জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা রাকিবুল ইসলাম ফারুকীকে বহিষ্কার করার ঘটনা নতুন করে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা প্রশ্নে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর নেতাদের বৈঠকের সিদ্ধান্তে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানা যায়।
একই সঙ্গে বিভাজন নিরসনে গঠিত সাব-কমিটি ১১-দলীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে একাধিক দফা বৈঠক করেছে বলেও সাংগঠনিক সূত্রগুলো জানায়।


রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভক্ত বাস্তবতা
গত কয়েক নির্বাচনী চক্রে সংগঠনটির অবস্থান ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত ইস্যুগুলোর একটি। কখনো নিরপেক্ষ অবস্থান, কখনো ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন—এই দ্বৈততা সংগঠনটির অভ্যন্তরে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
এক অংশ জামায়াত-সমর্থিত ১১-দলীয় জোটের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলেও, অন্য অংশ বিএনপিসহ ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে সক্রিয় ছিল। আবার একটি বড় অংশ নিজেদের সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়। এর ফলে হেফাজতের ঐতিহ্যগত “একক অবস্থান” দুর্বল হয়ে বহু-মেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।


শাপলা চত্বরের উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক চাপ
২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা সংগঠনটির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। ওই ঘটনার পর দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার ও মামলা-হয়রানি হেফাজতের সাংগঠনিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দেয়।পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হলেও সেই ক্ষত ও আস্থার সংকট পুরোপুরি নিরসন হয়নি। ফলে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখনো সেই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রভাব বহন করছে।


ঐক্য পুনর্গঠনের চেষ্টা
বর্তমান পরিস্থিতিতে সংগঠনটির কিছু শীর্ষ নেতা দাবি করছেন, বিভাজন থাকলেও “ইস্যুভিত্তিক ঐক্য” পুনরুদ্ধার সম্ভব। সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে ঐক্য পুনর্গঠন, মামলা প্রত্যাহার, এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়।
একাধিক নেতা জানিয়েছেন, হজ-পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় কার্যক্রম আরও সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে শাপলা চত্বরের ঘটনার বিচার ও বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সামনে এনে সংগঠনকে পুনরায় আন্দোলনমুখী করার ভাবনাও আলোচনায় আছে।


ভবিষ্যৎ: ঐক্য নাকি পুনর্বিন্যাস?
বিশ্লেষকদের মতে, হেফাজতের বর্তমান সংকট শুধুমাত্র সাংগঠনিক নয়; বরং এটি নেতৃত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রজন্মগত পরিবর্তনের সম্মিলিত সংকট।
একদিকে পুরোনো নেতৃত্বের ঐতিহ্য ও আদর্শিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে নতুন বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ও প্রভাবের প্রশ্ন সংগঠনটিকে নতুনভাবে বিভক্ত করছে।
ফলে সামনে হেফাজতের জন্য তিনটি সম্ভাব্য পথ দেখা যাচ্ছে—


সীমিত ঐক্যের মাধ্যমে পুনর্গঠন
আঞ্চলিকভাবে বিভক্ত কাঠামো বজায় রাখা
অথবা ধীরে ধীরে ইস্যুভিত্তিক চাপ-গ্রুপে রূপান্তর

সব মিলিয়ে “হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ” এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সংগঠনটি তার ঐতিহাসিক প্রভাব ও জনভিত্তি পুনরুদ্ধার করতে পারবে কি না—তা নির্ভর করছে নেতৃত্বের সমঝোতা, রাজনৈতিক দূরত্ব কমানো এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের ওপর। অন্যথায়, এক সময়ের শক্তিশালী ধর্মভিত্তিক আন্দোলনটি আরও খণ্ডিত ও আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

ফটিকছড়িতে নিষিদ্ধ সংগঠনের সমাবেশ

বিভক্তির ছায়ায় হেফাজতে ইসলাম: ঐক্যের চেষ্টা নাকি নতুন বাস্তবতা?

Update Time : ১১:৩৬:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

ইনভেস্টিগেটিভ প্রান্তিক প্রতিবেদন

কওমি মাদরাসাভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন -“হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ”- আবারও দাঁড়িয়ে আছে এক জটিল সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। এক সময়ের ব্যাপক গণআন্দোলন-ভিত্তিক শক্তি হিসেবে পরিচিত এই সংগঠনটি এখন অভ্যন্তরীণ বিভাজন, নেতৃত্ব সংকট এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে।


সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যক্রম দীর্ঘ বিরতির পর সীমিত পরিসরে পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা দেখা গেলেও, শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যকার মতভেদ ও আস্থাহীনতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি।


নেতৃত্ব সংকট ও সাংগঠনিক স্থবিরতা
২০২০ সালে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর থেকে হেফাজতের নেতৃত্ব কাঠামো ধারাবাহিক পরিবর্তন ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে গেছে। একের পর এক আমির ও মহাসচিব পরিবর্তন, গ্রেপ্তার-নির্যাতন, এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সংগঠনটির সাংগঠনিক ধারাবাহিকতাকে দুর্বল করেছে।
বিশেষ করে ২০২১ সালের পর থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যক্রম কার্যত অনিয়মিত হয়ে পড়ে। একাধিক অংশে বিভক্ত নেতৃত্বের কারণে জাতীয় পর্যায়ে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয়নি, যা সংগঠনটির ঐতিহ্যগত “ইস্যুভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন” চরিত্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।


সাম্প্রতিক বিভাজন ও বহিষ্কার সিদ্ধান্ত
সম্প্রতি সংগঠনটির ভোলা জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা রাকিবুল ইসলাম ফারুকীকে বহিষ্কার করার ঘটনা নতুন করে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা প্রশ্নে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর নেতাদের বৈঠকের সিদ্ধান্তে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানা যায়।
একই সঙ্গে বিভাজন নিরসনে গঠিত সাব-কমিটি ১১-দলীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে একাধিক দফা বৈঠক করেছে বলেও সাংগঠনিক সূত্রগুলো জানায়।


রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভক্ত বাস্তবতা
গত কয়েক নির্বাচনী চক্রে সংগঠনটির অবস্থান ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত ইস্যুগুলোর একটি। কখনো নিরপেক্ষ অবস্থান, কখনো ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন—এই দ্বৈততা সংগঠনটির অভ্যন্তরে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
এক অংশ জামায়াত-সমর্থিত ১১-দলীয় জোটের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলেও, অন্য অংশ বিএনপিসহ ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে সক্রিয় ছিল। আবার একটি বড় অংশ নিজেদের সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়। এর ফলে হেফাজতের ঐতিহ্যগত “একক অবস্থান” দুর্বল হয়ে বহু-মেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।


শাপলা চত্বরের উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক চাপ
২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা সংগঠনটির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। ওই ঘটনার পর দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার ও মামলা-হয়রানি হেফাজতের সাংগঠনিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দেয়।পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হলেও সেই ক্ষত ও আস্থার সংকট পুরোপুরি নিরসন হয়নি। ফলে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখনো সেই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রভাব বহন করছে।


ঐক্য পুনর্গঠনের চেষ্টা
বর্তমান পরিস্থিতিতে সংগঠনটির কিছু শীর্ষ নেতা দাবি করছেন, বিভাজন থাকলেও “ইস্যুভিত্তিক ঐক্য” পুনরুদ্ধার সম্ভব। সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে ঐক্য পুনর্গঠন, মামলা প্রত্যাহার, এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়।
একাধিক নেতা জানিয়েছেন, হজ-পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় কার্যক্রম আরও সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে শাপলা চত্বরের ঘটনার বিচার ও বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সামনে এনে সংগঠনকে পুনরায় আন্দোলনমুখী করার ভাবনাও আলোচনায় আছে।


ভবিষ্যৎ: ঐক্য নাকি পুনর্বিন্যাস?
বিশ্লেষকদের মতে, হেফাজতের বর্তমান সংকট শুধুমাত্র সাংগঠনিক নয়; বরং এটি নেতৃত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রজন্মগত পরিবর্তনের সম্মিলিত সংকট।
একদিকে পুরোনো নেতৃত্বের ঐতিহ্য ও আদর্শিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে নতুন বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ও প্রভাবের প্রশ্ন সংগঠনটিকে নতুনভাবে বিভক্ত করছে।
ফলে সামনে হেফাজতের জন্য তিনটি সম্ভাব্য পথ দেখা যাচ্ছে—


সীমিত ঐক্যের মাধ্যমে পুনর্গঠন
আঞ্চলিকভাবে বিভক্ত কাঠামো বজায় রাখা
অথবা ধীরে ধীরে ইস্যুভিত্তিক চাপ-গ্রুপে রূপান্তর

সব মিলিয়ে “হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ” এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সংগঠনটি তার ঐতিহাসিক প্রভাব ও জনভিত্তি পুনরুদ্ধার করতে পারবে কি না—তা নির্ভর করছে নেতৃত্বের সমঝোতা, রাজনৈতিক দূরত্ব কমানো এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের ওপর। অন্যথায়, এক সময়ের শক্তিশালী ধর্মভিত্তিক আন্দোলনটি আরও খণ্ডিত ও আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে