চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য রোধ এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৬৪ জেলার একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করেছে পুলিশ। এই তালিকায় মোট ৩ হাজার ৮৪৯ জন চাঁদাবাজের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগর এলাকায় রয়েছে ১ হাজার ২৫৪ জন। বাকি ব্যক্তিরা দেশের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় বলে জানা গেছে।
পুলিশের তথ্যমতে, এসব চক্র দীর্ঘদিন ধরে সড়ক, হাটবাজার, বালুমহাল, বাস ও টেম্পোস্ট্যান্ড, নৌঘাট, মাছবাজার, ভ্রাম্যমাণ কাঁচাবাজার, সরকারি লিজকৃত জমিতে গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পাইকারি আড়ৎ এবং বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে আসছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া, তালা ঝুলিয়ে দেওয়া কিংবা নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের তালিকাভুক্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ও পরিবর্তন করে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। একপর্যায়ে তারা নতুন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের ছত্রছায়ায় সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং চাঁদা আদায় অব্যাহত রাখে।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চাঁদাবাজির মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ কিছু অসাধু রাজনৈতিক নেতা ও দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যদের কাছেও পৌঁছে যায়—ফলে দীর্ঘদিন ধরে এ চক্র প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
গাজীপুরে ৩৪ জন চাঁদাবাজের তালিকা
দেশব্যাপী তালিকা প্রণয়নের অংশ হিসেবে গাজীপুর জেলায় ৩৪ জনের নাম উঠে এসেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, গাজীপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পরিবহন, কাঁচাবাজার, শিল্পকারখানা, বালুমহাল ও নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্র সক্রিয় রয়েছে।
জাতীয় দৈনিক যুগান্তরসহ একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সদর উপজেলার মনিপুর এলাকায় ইউনিসেন্স অ্যাপারেল লিমিটেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এক লিখিত অভিযোগে জানান, একটি ট্রাক আটকে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। পরে দেড় লাখ টাকা নেওয়ার পর ট্রাকটি ছেড়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
ওই ঘটনায় গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার নাম আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় এবং বহিষ্কারাদেশ প্রদান করে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। তবে অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
বর্তমানে পুলিশ যে ৩৪ জনের তালিকা প্রস্তুত করেছে, সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না হলেও স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখলবাণিজ্য ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগগুলো নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্পাঞ্চল ও বাজারকেন্দ্রিক এলাকায় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীরা প্রায়ই আতঙ্কে থাকেন। অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিছু চক্র নিয়মিত অর্থ আদায় করে থাকে।
গাজীপুর জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “কেউ রাজনৈতিক পরিচয়ে অপরাধ করলে ছাড় দেওয়া হবে না।”










